
‘কুরবানি’ আরবি ‘কুরবান’ (قربان) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ নৈকট্য বা সান্নিধ্য লাভ করা। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায়, জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে নির্দিষ্ট কিছু পশুকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জবেহ করাই হলো কুরবানি। এটি মূলত মহান আল্লাহর প্রতি বান্দার আনুগত্য, ত্যাগ ও ভালোবাসার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটঃ
কুরবানির ইতিহাস মানবজাতির সূচনালগ্ন থেকেই বিদ্যমান। বিস্তারিত ইতিহাস নিচে তুলে ধরা হলো: আদম (আ.)-এর যুগ: পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম কুরবানি করেছিলেন হযরত আদম (আ.)-এর দুই সন্তান হাবিল ও কাবিল। আল্লাহ তাআলা হাবিলের নিষ্ঠাপূর্ণ কুরবানি কবুল করেছিলেন।
ইব্রাহিম (আ.)-এর আদর্শঃ বর্তমান যুগে আমরা যে নিয়মে কুরবানি করি, তা মূলত হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নাত। মহান আল্লাহ তাঁকে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু, পুত্র ইসমাঈল (আ.)-কে কুরবানি করার স্বপ্নদেশ দেন। আল্লাহর আদেশে পিতা ও পুত্র উভয়েই যখন ত্যাগের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করলেন, তখন আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে ইসমাঈলের পরিবর্তে একটি দুম্বা জান্নাত থেকে পাঠিয়ে তা জবেহ করার ব্যবস্থা করেন। এই ঐতিহাসিক ত্যাগকে স্মরণ করেই প্রতি বছর ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়।
কুরবানির মূল উদ্দেশ্য ও দর্শনঃ
পশুর রক্ত বা মাংস আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় বান্দার অন্তরের তাকওয়া ও পরহেজগারি। কুরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো:আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন: লোকদেখানো বা সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির মানসিকতা পরিহার করে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু উৎসর্গ করা।
অহংকার ও পশুত্ব বিসর্জন: নিজের ভেতরের লোভ, হিংসা ও অহংকারকে পশুর সাথে কোরবানি করা।সামাজিক সম্প্রীতি: ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য দূর করে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
কুরবানির গুরুত্ব ও ফজিলত (সহিহ হাদিসের আলোকে)
কুরবানির গুরুত্ব কতখানি তা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর বাণী থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত:
- রাসুল (সা.)-এর নিয়মিত আমল: হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত:“নবী কারীম (সা.) দুটি শিংওয়ালা চিতি রঙের দুম্বা কুরবানি করতেন। তিনি নিজের পা সেগুলোর পাঁজরের ওপর রাখতেন এবং বিসমিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার বলে নিজের হাতে জবেহ করতেন।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৫৫৬৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯৭৬]
- সামর্থ্যবানের জন্য কঠোর নির্দেশ: রাসুলুল্লাহ (সা.) সামর্থ্য থাকার পরও কুরবানি না করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন:“যার কুরবানি করার সামর্থ্য আছে, অথচ সে কুরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।” [মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ৩১২৩; হাদিসটি হাসান/সহিহ]
কুরবানির সময়কাল ও প্রধান শর্ত
ঈদের নামাজের আগে কুরবানি করলে তা আদায় হবে না, তা সাধারণ মাংস হিসেবে গণ্য হবে।
- নামাজের পর জবেহ করা: হযরত বারা ইবনে আজেব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন:“আজকের দিনে আমাদের প্রথম কাজ হলো ঈদের নামাজ আদায় করা, এরপর ফিরে এসে কুরবানি করা। যে ব্যক্তি এভাবে করবে, সে আমাদের সুন্নাত অনুসরণ করল। আর যে ব্যক্তি নামাজের পূর্বেই জবেহ করল, তা কেবলই সাধারণ মাংস যা সে নিজের পরিবারের জন্য অগ্রিম ব্যবস্থা করল, এর সাথে কুরবানির কোনো সম্পর্ক নেই।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৯৬৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯৬১]
কেমন পশু দ্বারা কুরবানি করতে হবে?
পশু নিখুঁত, সুস্থ এবং নির্দিষ্ট বয়সের হওয়া বাধ্যতামূলক। হাদিসে ত্রুটিযুক্ত পশুর ব্যাপারে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে:
- ত্রুটিমুক্ত পশুর বিবরণ: হযরত বারা ইবনে আজেব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, চার ধরনের পশু দ্বারা কুরবানি জায়েজ নয়:
- ১. “স্পষ্ট অন্ধ পশু।
২. স্পষ্ট রোগাক্রান্ত পশু।
৩. স্পষ্ট খোঁড়া পশু, যা ভালো করে হাঁটতে পারে না।
৪. এমন জীর্ণ-শীর্ণ পশু, যার হাড্ডিতে কোনো মজ্জা নেই।” [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ২৮০২; সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ১৪৯৭, হাদিসটি সহিহ] - পশুর বয়স: পশুর বয়সের ব্যাপারে হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন:“তোমরা কেবল ‘মুসিন্না’ (নির্দিষ্ট বয়সের) পশুই জবেহ করবে। তবে তা যদি তোমাদের জন্য কষ্টকর হয়, তবে ছয় মাসের ভেড়া বা দুম্বা জবেহ করতে পারো।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯৬৩] (উল্লেখ্য, মুসিন্না বলতে উটের ক্ষেত্রে ৫ বছর, গরু-মহিষের ক্ষেত্রে ২ বছর এবং ছাগল-ভেড়ার ক্ষেত্রে ১ বছর পূর্ণ হওয়া বুঝায়)।
আরও পড়ুনঃ মাভাবিপ্রবির নতুন উপাচার্য ঢাবি অধ্যাপক শহিদুল ইসলামের যোগদান
কুরবানির পশুতে অংশীদারিত্ব (ভাগ)
বড় পশুতে (গরু, মহিষ, উট) সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারবেন, যা সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত:
- সাত ভাগে কুরবানি: হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:“আমরা হুদাইবিয়ার বছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে কুরবানি করেছিলাম। সেখানে আমরা একটি উটে সাতজন এবং একটি গরুতে সাতজন শরিক হয়েছিলাম।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৩১৮]
মাংস বণ্টন ও চামড়ার বিধান
কুরবানির মাংস নিজে খাওয়া, সংরক্ষণ করা এবং দান করার ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে:
- মাংস বণ্টন: হযরত জাবের (রা.) রাসুল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন:“তোমরা নিজেরা খাও, অন্যকে খাওয়াও (দান করো) এবং সংরক্ষণ করে রাখো।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯৭১]
- কসাইয়ের পারিশ্রমিক ও চামড়া: কুরবানির পশুর কোনো অংশ বা চামড়া কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া যাবে না। হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত:“রাসুল (সা.) আমাকে তাঁর কুরবানির উটগুলোর তদারকি করতে আদেশ করেন এবং নির্দেশ দেন যে, আমি যেন তার মাংস, চামড়া ও পিঠের ঝাল (পরিধেয় বস্ত্র) সদকা করে দেই। আর এর থেকে কসাইকে কোনো কিছু (মজুরি হিসেবে) দিতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, কসাইয়ের মজুরি আমরা আমাদের পক্ষ থেকে দেব।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ১৭১৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৩১৭]
কুরবানি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উৎসব নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি আত্মশুদ্ধির মাধ্যম। সঠিক নিয়মে এবং খাঁটি নিয়তে কুরবানি আদায়ের মাধ্যমেই এর প্রকৃত সামাজিক ও আধ্যাত্মিক সুফল লাভ করা সম্ভব।



