

নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, ‘Young people are not job seekers, they are job creators.’ অর্থাৎ 'তরুণরা শুধু চাকরি খোঁজার জন্য জন্ম নেয় না; তারা নতুন কর্মসংস্থান, নতুন ধারণা এবং নতুন সম্ভাবনার স্রষ্টা।' কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কি সেই স্রষ্টা তৈরি করতে পারছে?
বিগত তিন দশকে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। একই সঙ্গে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারত্ব এবং কর্মক্ষেত্রের চাহিদা ও দক্ষতার মধ্যে ব্যবধান। নিয়োগদাতাদের অভিযোগ স্পষ্ট—শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি আছে, কিন্তু সমস্যা সমাধানের দক্ষতা নেই; সিজিপিএ আছে, কিন্তু যোগাযোগ দক্ষতা নেই; নেতৃত্ব, উদ্ভাবন এবং অভিযোজন ক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। প্রশ্ন হলো, এই অবস্থার জন্য দায়ী কে?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের শিক্ষাদর্শনের দিকে তাকাতে হয়। তিনটি মূল ধারণা এখানে গুরুত্বপূর্ণ—শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষা (Pedagogy), শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা (Andragogy) এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা (Heutagogy)।
আমাদের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও শিক্ষককেন্দ্রিক শিক্ষার আধিপত্য রয়েছে। এখানে শিক্ষকই সব সিদ্ধান্ত নেন—কী পড়ানো হবে, কীভাবে পড়ানো হবে এবং কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে। সহজ উপমায়, এটি 'বোতল ফিডিং'—শিশু নিজে চিন্তা করে না, মা যা দেয় তাই খায়। ফলে শিক্ষার্থীরা শেখে কীভাবে পরীক্ষায় নম্বর তুলতে হয়, কিন্তু শেখে না কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, গবেষণা করতে হয় বা বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যা সমাধান করতে হয়।
প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা অধিক কার্যকর। এখানে শিক্ষার্থী শুধু জ্ঞান গ্রহণকারী নয়; তার অভিজ্ঞতা, প্রয়োজন এবং আগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ। তবে আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে আরও প্রয়োজন শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা। এখানে শিক্ষার্থী নিজেই শেখার লক্ষ্য নির্ধারণ করে, তথ্য খুঁজে বের করে, নতুন জ্ঞান তৈরি করে এবং নিজের শেখার মূল্যায়ন করে। শিক্ষক এখানে জ্ঞানের একমাত্র উৎস নন; তিনি একজন পথপ্রদর্শক ও সহায়তাকারী।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে লেকচার ভিত্তিক না রেখে কেস স্টাডি, প্রজেক্ট ভিত্তিক, ইন্টার্নশিপ ও গবেষণার সাথে যুক্ত করতে হবে। একজন উদ্যোক্তা বই পড়ে উদ্যোক্তা হয় না; তাকে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়, বাজার বিশ্লেষণ করতে হয় এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
ইউনেস্কোর শিক্ষা দর্শন অনুযায়ী, শিক্ষা শুধু জানার শিক্ষা (Learning to Know) নয়। এর সাথে জরুরি কাজ করা (Learning to Do), নিজের প্রয়োজনীয় শিক্ষাকে ধারণ করা (Learning to Be), মিলেমিশে বসবাস করা (Learning to Live Together) এবং নিজের ও সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা (Learning to Transform)। শিক্ষার লক্ষ্য শুধু তথ্য অর্জন নয়; বরং ব্যক্তি ও সমাজকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করার সক্ষমতা অর্জন।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষায় জরুরি কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন—
শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে, অনুসন্ধান করতে এবং নতুন জ্ঞান তৈরি করতে উৎসাহিত করতে হবে। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র প্রযুক্তি-নির্ভর হবে, তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা অপরিহার্য। শিক্ষক শুধু তথ্য প্রদানকারী নন; তারা শিক্ষার্থীকে শেখার পথ দেখান।
আরও পড়ুনঃ জবির সাবেক শিক্ষার্থী যুবদলের কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আজীবন শেখার সংস্কৃতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি শিক্ষার সমাপ্তি নয়; এটি শেখার একটি নতুন যাত্রার সূচনা। ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র এমন মানুষ চায় না যারা শুধু উত্তর জানে; বরং যারা নতুন প্রশ্ন করতে পারে।
প্রফেসর ইউনূসের ভাষায়, আমাদের তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, সম্ভাবনার স্রষ্টা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আর সেই যাত্রার সূচনা হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকেই।
শিক্ষা যদি মুখস্থবিদ্যা থেকে মুক্ত হয়ে অনুসন্ধান, উদ্ভাবন এবং আত্মনির্ভর শিক্ষার দিকে এগোয়, তবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা শুধু দক্ষ গ্র্যাজুয়েট নয়, ভবিষ্যতের জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির নেতৃত্বদানকারী নাগরিকও তৈরি করতে পারবে। কারণ ভবিষ্যৎ তাদের নয় যারা সবচেয়ে বেশি মুখস্থ করতে পারে; ভবিষ্যৎ তাদের, যারা দ্রুত শিখতে পারে, প্রয়োজনে পুরনো জ্ঞানকে প্রশ্ন করতে পারে এবং নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
লেখকঃ
সহযোগী অধ্যাপক ড. ফুয়াদ হোসেন
ডীন, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অনুষদ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।