

আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার চিন্তা করার ক্ষমতা। আমার কাছে সেই কথাটিরই আরেকটি বাস্তব রূপ ফুটে ওঠে ফুটবল কিংবা রাজনীতির মতো আবেগঘন বিষয়গুলোতে। কারণ, মানুষ যখন অন্ধ সমর্থকে পরিণত হয়, তখন সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতাও অনেক সময় হারিয়ে ফেলে।
আমাদের সমাজের একটি বড় সমস্যা হলো অন্ধ অনুসরণ। কেউ যদি কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে, তাহলে সেই দলের ভুলকেও সঠিক মনে করে। আবার অনেক কর্মী এমনও আছেন, যারা নেতাকে এতটাই নিঃশর্তভাবে অনুসরণ করেন যে, নিজের বিবেক-বিবেচনার জায়গাটুকুও হারিয়ে ফেলেন। এই অন্ধ ভক্তিই আমাদের মানুষ হিসেবে ছোট করে এবং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। এই প্রসঙ্গ টানার কারণ গত মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচ।
আমি ফুটবলের অন্ধ সমর্থক নই। বিশ্বকাপ এলেই দামি জার্সি কেনা, পতাকা টানানো, মিছিল করা কিংবা প্রিয় দল হারলে অঝোরে কান্না করা—এসব কখনোই আমাকে খুব একটা টানে না। তবে গত রাতের ম্যাচটি খেতে খেতে দেখছিলাম। খেলার শুরুতেই লিওনেল মেসির পেনাল্টি মিস করা থেকে শুরু করে পুরো ম্যাচই ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর।
আমার মা, যিনি ফুটবলের নিয়মকানুন খুব একটা বোঝেন না, খেলা দেখে হঠাৎ বললেন, “সাদা জার্সির পিলিয়াররা তো পাজি!”
এরপর ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই উত্তেজনা বেড়েছে। বাংলাদেশের অনেক ব্রাজিল সমর্থকও মিশরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কেউ মুসলিম দেশ হিসেবে মিশরকে সমর্থন করেছেন, কেউ আবার নিজেদের ফুটবলীয় পছন্দ থেকে। কিন্তু ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই পক্ষের সমর্থকদের কটূক্তি ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য খেলাধুলার সৌন্দর্যকে ম্লান করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন— "আর্জেন্টিনা + ফিফা + রেফারি = ৩ গোল" আবার কেউ মন্তব্য করেছেন— "স্বরযন্ত্র কইরা মিশররে হারানো হইছে। এত খারাপ খেইলাও এত আনন্দ ভালো না। পুরা ফিফা টিম, রেফারি, থার্ড রেফারি মিলা… ছি ছি, লজ্জা!"
অন্যদিকে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা এই ম্যাচকে 'বক্স অফিস হিট থ্রিলার' বলেও অভিহিত করেছেন। ডেইলি স্টারে কর্মরত সাংবাদিক আলীম হোসেন ফেসবুকে লিখেছেন— "আজ আর্জেন্টিনা আবার দেখিয়ে দিল—গ্রেট টিম মানে শুধু সুন্দর ফুটবল খেলা না। গ্রেট টিম মানে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত বিলিভ করে যাওয়া।"
তিনি আরও লিখেছেন, আর্জেন্টিনার দলীয় ঐক্য, নেতৃত্ব এবং কঠিন মুহূর্তে ফিরে আসার মানসিকতাই তাদের শক্তি। নিঃসন্দেহে এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি।
অন্যদিকে মিশরের প্রধান কোচ হোসাম হাসান ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, তার দলের একটি বৈধ গোল বাতিল করা হয়েছে এবং কিছু সিদ্ধান্ত ন্যায়সঙ্গত হয়নি। তিনি বলেন, মনে হয়েছে লিওনেল মেসি ও আর্জেন্টিনাকে টুর্নামেন্টে ধরে রাখার প্রবণতা কাজ করেছে।
এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মধ্যেও এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু এটুকু বলা যায়, ম্যাচটির রেফারিং এবং ভিএআর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি হলো, ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হারলেও মিশর লড়াই করে মানুষের হৃদয় জয় করেছে। ফুটবলে জয়-পরাজয় থাকবে। শেষ পর্যন্ত ফলাফলই ইতিহাসে লেখা থাকে। আর্জেন্টিনা জিতেছে—এটাই বাস্তবতা। কিন্তু আমার অনুভূতির জায়গা অন্যত্র।
আমি সব সময় নির্যাতিতের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। আমার কাছে মনে হয়েছে, এই ম্যাচে মিশর কিছু সিদ্ধান্তের কারণে বঞ্চিত হয়েছে। এই উপলব্ধি থেকেই আমার মনে পড়েছে ইসলামে জুলুম সম্পর্কে কঠোর সতর্কবাণীর কথা।
হযরত আবু বকর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, "মানুষ যদি কোনো জালেমকে জুলুম করতে দেখেও তার হাত (অপরাধ করা থেকে) চেপে না ধরে, শীঘ্রই আল্লাহ তাদের সবাইকে সাধারণ শাস্তির সম্মুখীন করবেন।" (আবু দাউদ, তিরমিজি)
এই হাদিস আমাকে সব সময় মনে করিয়ে দেয়, অন্যায় দেখেও নীরব থাকা উচিত নয়।
তাই আমার উপলব্ধি—ফুটবলকে অবশ্যই খেলার আনন্দ হিসেবে দেখা উচিত। কিন্তু কোনো দল, খেলোয়াড় কিংবা সংগঠনের প্রতি এমন অন্ধ ভক্তি তৈরি হওয়া উচিত নয়, যাতে সত্যকে দেখার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলি।
আরও পড়ুনঃ ইবি অধ্যাপকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঘিরে নতুন বিতর্ক
একই সঙ্গে আমি মনে করি, বিদেশি দলের জার্সি, পতাকা কিংবা আনুষঙ্গিক সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও আমাদের সংযমী হওয়া উচিত। অপ্রয়োজনীয় অপচয় ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
অনেকে হয়তো বলবেন, খেলাধুলা আর ধর্ম এক নয়। তাদের জন্য পবিত্র কোরআনের আয়াত—
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নির্দেশ দিয়েছেন: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা পুরোপুরি ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না; কেননা সে তোমাদের সুস্পষ্ট দুশমন।"
(সূরা আল-বাকারার ২০৮ নং আয়াত)
ফুটবল একটি খেলা। কিন্তু সেই খেলাকে ঘিরে আমাদের আচরণ, মূল্যবোধ এবং বিবেকের ব্যবহারই শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রকৃত পরিচয় বহন করে। জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষেই আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত।
লেখকঃ শেখ নজরুল ইসলাম
একটিভিস্ট ও সাংবাদিক।