

মোঃ সাকিবুল ইসলাম স্বাধীন, রাজশাহী প্রতিনিধিঃ পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্য একটি অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একের পর এক সংবাদ প্রকাশ, ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ এবং রেল ভবনের ভেতরে প্রকাশ্যে ফোনালাপের প্রমাণ সামনে এলেও আজও বহাল রয়েছেন অভিযুক্ত শ্রমিক লীগের প্রচার সম্পাদক ও রেলের সরঞ্জাম দপ্তরের অফিস সহকারী মোঃ সত্যব্রত ইসলাম হৃদয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, হৃদয় আওয়ামী লীগের পোষ্য কোটায় চাকরি লাভ করেন এবং তার পরিবারের অন্তত ১৫ জন সদস্য বর্তমানে রেলের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া জুলাই আন্দোলন দমনে সক্রিয় ভূমিকা পালন, হাতে লাঠি নিয়ে মহড়া দেওয়া এবং ছাত্র–জনতার ওপর হামলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বরং একাধিক অভিযোগের পরও হৃদয় যুবদলের ছত্রছায়ায় চাকরি বহাল রেখে অনিয়মে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে পশ্চিমাঞ্চল রেল প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তদন্ত থামাতে সাংবাদিকদের মামলার হুমকি দেওয়া, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার এবং সাবেক রেল কর্মকর্তাদের আশ্রয়ে পুরো সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
তদন্তে নিয়োগ বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে তিনজনের নাম— পশ্চিমাঞ্চল রেলের সাবেক কর্মকর্তা বেলাল উদ্দিন, শ্রমিক লীগের প্রচার সম্পাদক ও রেলের অফিস সহকারী হৃদয় এবং যুবদলের নাম ব্যবহারকারী শাহীন ওরফে বালতি শাহীন। অভিযোগ রয়েছে, এই তিনজনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।
এছাড়া পশ্চিমাঞ্চল রেলের সাবেক কর্মকর্তা রাসেদ ইবনে আকবর এই নিয়োগ ও টেন্ডার সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে দীর্ঘদিন রেলে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্টের পর এসব অভিযোগ প্রকাশ পেলে তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হলেও সেখান থেকে বেলাল উদ্দিন, হৃদয় ও শাহীনের মাধ্যমে পশ্চিমাঞ্চল রেলের নিয়োগ ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী সাব্বির হোসেন জানান, সাড়ে তিন লাখ টাকার বিনিময়ে রাজশাহীতে রেলের অফিস সহকারী পদে চাকরির প্রলোভন দেখানো হয় তাকে। প্রথমে দেড় লাখ টাকা নেওয়া হলেও পরে তাকে সৈয়দপুরে নিয়ে গিয়ে অফিস সহকারী নয়, দৈনিক লেবার হিসেবে যোগদান করানো হয়। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি চাকরি না নিয়ে ফিরে আসেন এবং টাকা ফেরত চাইলে নানা অজুহাতে তাকে ঘোরানো হতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি বোয়ালিয়া থানায় হৃদয় ও শাহীনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
ভুক্তভোগীর ভাগ্নে আল আমিন অভিযোগ করেন, সংবাদ প্রকাশের পরও হৃদয় হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিয়ে ঢাকা–রাজশাহী রুটের ট্রেনে অ্যাটেনডেন্ট নিয়োগের প্রস্তাব দেন এবং দ্রুত যোগাযোগ করতে বলেন। এতে করে স্পষ্ট হয় যে, সংবাদ প্রকাশও এই সিন্ডিকেটকে থামাতে পারেনি।
এদিকে রাজশাহীর সংবাদকর্মী ও ভুক্তভোগীরা পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদের কাছে অভিযোগ দিতে গেলে জিএমের সামনেই হৃদয়ের ফোনালাপ লাউড স্পিকারে শোনা যায়। ফোনালাপে চাকরির ব্যবস্থা ও টাকা নেওয়ার কথা শুনে মহাব্যবস্থাপক তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুনঃ রাজশাহী কলেজের নবনিযুক্ত অধ্যক্ষকে আরসিআরইউ’র ফুলেল শুভেচ্ছা
সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক দপ্তর জানিয়েছে, অভিযোগ সিপিও দপ্তরে পাঠানো হয়েছে এবং প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আনোয়ার হোসেন দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠনের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে অভিযোগের পরও কেন হৃদয়ের চাকরি বহাল রয়েছে এবং কেন এখনো দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি— তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
যুবদলের শীর্ষ নেতারা দাবি করেছেন, শাহীন যুবদলের কোনো অফিসিয়াল সদস্য নন। তবে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, তিনি ১৯ নম্বর ওয়ার্ড দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক প্রার্থী হিসেবে আবেদন করেছেন। ফলে যুবদলের নাম ব্যবহার করে শ্রমিক লীগ নেতাকে রক্ষা করার সাহস তিনি কোথা থেকে পেলেন, সে প্রশ্নও উঠেছে।
সব মিলিয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলের নিয়োগ বাণিজ্য এখন আর বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়, বরং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা একটি সংগঠিত সিন্ডিকেটে রূপ নিয়েছে। তদন্ত আদৌ বাস্তবায়িত হবে নাকি আগের মতোই ফাইলচাপা পড়ে থাকবে— সেটাই এখন দেখার বিষয়।