spot_img

― Advertisement ―

spot_img
প্রচ্ছদশিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনক্যাম্পাসহুমকির মুখে জাবির জীববৈচিত্র্য: পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন ও আগুনে পুড়ছে সবুজ ক্যাম্পাস

হুমকির মুখে জাবির জীববৈচিত্র্য: পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন ও আগুনে পুড়ছে সবুজ ক্যাম্পাস

মোঃ আবু বকর সিদ্দিক, জাবি প্রতিনিধিঃ প্রজাপতির ডানা ঝাপটানো, অতিথি পাখির কলতান আর সবুজ অরণ্যের শান্ত আবহ—এই তিনের মিলনে গড়ে উঠেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের অন্যতম আবাসিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই ‘সবুজ ক্যাম্পাস’ হিসেবে পরিচিত। প্রায় সাতশ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষার জন্যই নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও দেশজুড়ে সুপরিচিত। সারা বছরই সবুজ-প্রকৃতিপ্রেমী দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর থাকে ক্যাম্পাসটি।

কয়েক বছর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়কে চলাচলের সময় চোখে পড়ত গুঁইসাপ, বেজি, গিরগিটি, কাঠবিড়ালিসহ নানা ছোট প্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ। রাতে শোনা যেত শিয়াল, বাগডাশ, হুতুম পেঁচা কিংবা লক্ষ্মীপেঁচার ডাক। যেন শহরের ভেতরেই এক গ্রামীণ প্রকৃতির আবহ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন, ঝোপঝাড়ে আগুন লাগানো এবং পরিবেশ বিষয়ে অসচেতনতার কারণে ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে।

আগুনে পুড়ছে ঝোপঝাড়, ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেট অফিসের তত্ত্বাবধানে প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে বিভিন্ন এলাকা পরিষ্কার করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ঝোপঝাড় কাটার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে আগুন লাগিয়ে সেগুলো পরিষ্কার করা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ আগুন প্রায়ই নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে আশপাশের বনাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

এ বছর আল-বেরুনী হলের পেছনের এলাকা, কাজী নজরুল ইসলাম হল-সংলগ্ন বনাঞ্চল, প্রশাসনিক ভবনের সামনের লেকপাড়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের দক্ষিণ পাশ, সুইমিং পুল-সংলগ্ন এলাকা, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের সামনে, আল-বেরুনী সম্প্রসারিত হলের পেছনের মাঠ এবং জহির রায়হান মিলনায়তন এলাকার আশপাশে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যায়। এসব এলাকায় ছোট প্রাণী, পাখির বাসা ও নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আগুনে শুধু দৃশ্যমান ঝোপঝাড়ই নয়, মাটির নিচের অণুজীব, কীটপতঙ্গ ও ডিমও ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি।

কমছে শীতকালে অতিথি পাখির উপস্থিতি

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তথ্যমতে, ১৯৮৬ সাল থেকে ক্যাম্পাসের জলাশয়গুলোতে পরিযায়ী পাখি আসছে। এখন পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ২০৪ প্রজাতির পাখির দেখা মিলেছে—এর মধ্যে ১২৬টি দেশি ও ৭৮টি বিদেশি প্রজাতি। প্রশাসনিক ভবনের সামনের লেকসহ বিভিন্ন জলাশয় দীর্ঘদিন ধরেই অতিথি পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উঁচু ইট-কাঠের স্থাপনা নির্মাণ, জলাশয় ভরাট এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতার কারণে পাখির আগমন তুলনামূলকভাবে কমে গেছে বলে দাবি শিক্ষার্থীদের। এক শিক্ষার্থী বলেন, “মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া উন্নয়ন হওয়ায় প্রকৃতি আজ ধ্বংসের মুখে। আগের মতো শীতকালে অতিথি পাখি আর দেখা যায় না।”

মাস্টারপ্ল্যান থেকে বিচ্যুতির অভিযোগ

১৯৬৮ সালে প্রখ্যাত স্থপতি মাজহারুল ইসলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এর প্রথম মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) প্রণয়ন করেন। সেই পরিকল্পনায় আবাসিক চরিত্র, খোলা সবুজ এলাকা এবং জলাশয় সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই মাস্টারপ্ল্যান থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচ্যুতি ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প চলমান। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে অবকাঠামোগত উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে তা হতে হবে পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিয়ে—এমনটাই মত সচেতন মহলের।

উন্নয়ন বনাম পরিবেশ—ভারসাম্যের প্রশ্ন

বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তুসংস্থানের প্রতি অবহেলা অব্যাহত থাকলে ‘সবুজ ক্যাম্পাস’ ধীরে ধীরে ইট-পাথরের নগরকাঠামোয় পরিণত হবে। পুরনো ও জরাজীর্ণ ভবন অপসারণ করে একই জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতে পারে। এতে নতুন করে বনভূমি বা জলাশয় নষ্ট করার প্রয়োজন পড়বে না।

আরেক শিক্ষার্থী বলেন, “অবকাঠামো উন্নয়ন যে দরকার নেই, তা আমরা বলছি না। কিন্তু গাছ কেটে, জলাশয় ভরাট করে উন্নয়ন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেকোনো নির্মাণের আগে পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।”

‘জীবন্ত ল্যাবরেটরি’ রক্ষায় আহ্বান

গাছ-পাখি, লতা-পাতা, ফুল ও জলাধারের সমন্বয়ে অনেকেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-কে ‘জীবন্ত ল্যাবরেটরি’ বলে অভিহিত করেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যেমন শিক্ষার্থী আসে, তেমনি পৃথিবীর নানা অঞ্চল থেকে আসে পরিযায়ী পাখি। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

পরিবেশবিদদের মতে, ঝোপঝাড়ে আগুন দেওয়ার পরিবর্তে পরিবেশসম্মত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালু করা, নতুন স্থাপনা নির্মাণে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণ, জলাশয় ও বনাঞ্চল সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী—সবার মধ্যে পরিবেশ-সচেতনতা বাড়াতে হবে।

আরও পড়ুনঃ ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া ও চাঁদাবাজি সহ্য করা হবে না: শেখ রবিউল আলম

সবুজ, প্রাণবন্ত ও আবাসিক চরিত্রের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে এখনই পরিকল্পিত ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো আর দেখবে না সেই প্রাণচঞ্চল, প্রকৃতিনির্ভর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে—যে বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ছিল প্রজাপতি, পাখি আর সবুজের অপরূপ মিলনমেলা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক ইকোসিস্টেমেরও অংশ। এখানে অসংখ্য জলাশয়, গাছপালা, পাখি ও জীববৈচিত্র্য রয়েছে, যা দেশের অন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একে আলাদা করেছে। তাই যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান থাকা অত্যন্ত জরুরি। মাস্টারপ্ল্যান না থাকায় কোথাও জলাশয় ভরাট হচ্ছে, কোথাও নির্বিচারে গাছ কাটা পড়ছে; জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। সামগ্রিক পরিবেশের ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে, যা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের ৫১তম আবর্তনের শিক্ষার্থী সাদিকুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ইট-পাথরের স্থাপনা দিয়ে গড়ে ওঠে না; এর পরিচয় গড়ে ওঠে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নিরিবিলি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মাধ্যমে। তাই পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অন্যায় হবে। মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত করে, পরিবেশগত সমীক্ষার ভিত্তিতে এবং সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নিয়ে যেকোনো উন্নয়নকাজ শুরু করা উচিত। এতে জাবির প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা পাবে। জীববৈচিত্র্য ও প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা পেলেই রক্ষা পাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।