

বুটেক্স প্রতিনিধিঃ রাজনীতি নিষিদ্ধ বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স) ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বুটেক্স শাখা কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনা এবং তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
সোমবার (২২ জুন) বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজ থেকে এই কমিটি ঘোষণা করা হয়। কমিটিতে সভাপতি হিসেবে বুটেক্সের ৪৪তম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. জাহিদ হাসান জয়, সাধারণ সম্পাদক ৪৬তম ব্যাচের আলী মাহমুদ হাসান প্রতীক। এছাড়াও সহ-সভাপতি এবং যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মো. ফারহান ইশরাক জিসান এবং খন্দকার তাজ মোহাম্মদকে।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের এক জরুরি সভায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সকল ধরনের রাজনৈতিক ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ এবং সম্পৃক্ততা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তবে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার পরও ছাত্রলীগের মতো নিষিদ্ধ সংগঠনের নতুন কমিটি ঘোষণার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
৪৯তম ব্যাচের ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মিরাজুল ইসলাম বলেন, "ক্যাম্পাসে ভর্তি হওয়ার পর থেকে জোন কালচার নামক একটা প্রথার সাথে পরিচিত হয়েছিলাম। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই প্রথা ছাত্রলীগেরই তৈরি করা ছিল। প্রতিদিন দুপুর ১টা ১০ বাজলেই মাঠের মাঝে আমাদের দাঁড়া করায়ে বিভিন্ন রুলস শেখানো হতো, একটু পর সংসদে গিয়ে হ্যান্ডশেক করানো হতো। শুধু এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যা ছিল না। সমস্যা দেখা শুরু হল, যখন দেখলাম রুলসের দোহাই দিয়ে এরা আমাদেরকে র্যাগ দেওয়া বৈধ করে তুললো। হলে গেস্টরুম কালচারকে এরা বৈধ করে তুলেছিল। হলে জুনিয়রদের মাঝে অবৈধ মাদক ব্যবসা বৈধ করে তুলেছিল।"
তিনি আরও বলেন, "জুলাইয়ের সময় যখন আমরা শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ ওয়াসিম আকরামের রক্ত দেখে বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামলাম, তখন এরা আমাদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণের জন্য নিজেদের ফোর্স তৈরি করলো। সবকিছুরই নেপথ্যে ছিল নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ছাত্রলীগ। এই ছাত্রলীগের অনেকের নামে প্রশাসন বরাবর বারবার অভিযোগ জানানো হলেও প্রশাসন কখনোই আমাদের সহযোগিতা করেনি। আজকে তারা কমিটি প্রকাশ করার দুঃসাহস করলো। সামনে ক্যাম্পাসে আসারও হয়তোবা চেষ্টা করবে। সেই চেষ্টা আমাদের শিক্ষার্থীদেরই রুখে দিতে হবে, তা হোক পুলিশি মামলা দিয়ে অথবা নিজেদের সাহসী মনোভাব দিয়ে।"
৫০ তম ব্যাচের ইয়ার্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী জিহাদুল ইসলাম জুনায়েদ বলেন, "ছাত্ররাজনীতি - মুক্ত একটি ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের কমিটি প্রকাশ উদ্বেগেরই বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের সবসময় সজাগ থাকতে হবে, যাতে কোনো সংগঠনের রাজনৈতিক এজেন্ডা আমাদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত না হয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান থাকবে, আমরা যেন ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের ক্যাম্পাসের শিক্ষা, গবেষণা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রক্ষা করি।"
জুনায়েদ পূর্বের কথা মনে করে বলেন, "অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের এমন একটি ক্যাম্পাস গড়তে হবে, যেখানে আর কখনো কোনো ধরনের দমন-পীড়ন বা কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতি ফিরে আসতে না পারে। মনে রাখতে হবে আমরা যদি এসব প্রশ্রয় দেই, তাহলে এই অপরাজনীতির শিকার পরবর্তীতে আমাকে আপনাকেই হতে হবে।"
৫১ তম ব্যাচের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী আলি জুনায়েদ বলেন, "রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাসে এভাবে একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের কমিটি প্রকাশ খুবই উদ্বেগ জনক বিষয়। এখানে দেখা যাচ্ছে , সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখনো নীরব। এই নীরবতাই হয়তো ছাত্রলীগের মতো নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি সংগঠনকে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সাহস জোগাচ্ছে।"
আরও পড়ুনঃ অসহায় সাদ্দামের পাশে জবি ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার
তিনি বলেন, "বুটেক্স এর মতো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিষিদ্ধ ও বিতর্কিত সংগঠনের কমিটি ঘোষণার দুঃসাহস দেখানো সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে রাজনৈতিকভাবে সচেতন সবার জন্যই লজ্জাজনক। এখন পর্যন্ত সবাই নীরব, কিন্তু এই নীরবতা কতদিন? বিশেষ করে গতকাল ঘোষিত ছাত্রলীগের কমিটির বিষয়টি এখন ক্যাম্পাসজুড়ে এক ধরনের হাস্যকর ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রাজনীতিমুক্ত একটি ক্যাম্পাসে এমন ঘোষণাকে অধিকাংশ শিক্ষার্থী গুরুত্বের সঙ্গে না নিয়ে উপহাসের দৃষ্টিতেই দেখছে।"
এব্যাপারে বুটেক্সের প্রক্টর অধ্যাপক ড.মোঃ মাহবুবুর রহমান বলেন, বুটেক্সে এই মুহুর্তে সকল রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনে রাজনৈতিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেউ যদি এখানে কোন রাজনৈতিক কর্যক্রম পরিচালনা করতে চায় তবে তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রসঙ্গত, গত ১৭ বছর বুটেক্সে দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্যাতন ও নিপীড়নের অভিযোগ রয়েছে নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে ছাত্র ও অ্যালামনাইদের উপর হত্যাচেষ্টা চালায় নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মীরা। এছাড়াও চাঁদা দাবি করে ক্যান্টিন ভাঙচুর এবং নিষিদ্ধ বুটেক্স শাখা ছাত্রলীগের সাবেক নেতার রাজনৈতিক প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়েও বিভিন্ন মহলে অভিযোগ রয়েছে।