

নির্বাচনী ইশতেহারে জামাতের অঙ্গীকার পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র সংস্কার ও শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন। প্রকাশিত দলীয় ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামো থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, অর্থনীতি, মানবাধিকার ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জামাতের দাবি, এই রূপরেখা বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র, জনগণের ভোটাধিকার এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে।
ইশতেহারে বলা হয়েছে, গত দেড় দশকে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েমের ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণ ও কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণের শিকার হয়েছে। সংসদ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে, বিচার বিভাগ স্বাধীনতা হারিয়েছে এবং নির্বাচন ব্যবস্থা জনগণের আস্থা সম্পূর্ণভাবে হারিয়েছে। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্র সংস্কার ছাড়া দেশের সংকট উত্তরণ সম্ভব নয় বলে দলটি মনে করে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়ে ইশতেহারে বলা হয়েছে, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করাই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এজন্য একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচন কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমে স্বচ্ছ পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়, বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও আইনগত সংস্কার করা হবে। বিচারক নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়েও দলটি গুরুত্ব দিয়েছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক ক্ষমতার পরিবর্তে সংসদ, মন্ত্রিসভা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য নিশ্চিত করা হবে। সংসদকে আইন প্রণয়ন ও সরকারের জবাবদিহির মূল কেন্দ্র হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ে দলটির অবস্থান স্পষ্ট। ইশতেহারে বলা হয়েছে, ভিন্নমত দমন, গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। ক্ষমতায় গেলে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কালো আইন বাতিল ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক খাতে দলটি বৈষম্যহীন উন্নয়ন ও দুর্নীতিমুক্ত অর্থনীতির রূপরেখা তুলে ধরেছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট, ব্যাংকিং খাত ধ্বংস এবং অর্থপাচারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এসব অনিয়মের শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং অর্থপাচারকারীদের সম্পদ উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ইবি দুই শিক্ষার্থী গুমের ১৪ বছর: সন্ধানের দাবিতে মানববন্ধন
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দলটির মতে, কেন্দ্রীয়করণ রাষ্ট্র পরিচালনায় অকার্যকর ও অগণতান্ত্রিক। তাই ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের প্রকৃত ক্ষমতা ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়ন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দলটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব বাড়ানোর কথা বলেছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, শিক্ষাকে বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করা হয়েছে এবং স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ক্ষমতায় গেলে সার্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা চালু, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার করা হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দলটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাভিত্তিক কূটনীতির কথা উল্লেখ করেছে। ইশতেহারে বলা হয়েছে, কোনো রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী চাপ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে প্রাধান্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালিত হবে।
দলীয় নেতারা বলছেন, এই ইশতেহারে কেবল একটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার দলিল। তাদের মতে, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক ঐক্যের মাধ্যমেই এই সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব। তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, জনগণ এই রূপরেখাকে সমর্থন করলে বাংলাদেশ আবারও গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার পথে ফিরে যেতে পারবে।