

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশবাসীর সামনে আসছে এক গুরুত্বপূর্ণ গণভোট। ব্যালট পেপারে থাকবে মাত্র দুটি ঘর—'হ্যাঁ' অথবা 'না'। কিন্তু এই একটিমাত্র সিলের ভেতরে জড়িয়ে আছে ৮৪টি বিস্তৃত ও জটিল প্রস্তাব।
এই প্রস্তাবগুলো রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংবিধান, নির্বাচন, বিচার, প্রশাসন, অর্থনীতি ও মানবাধিকারসহ প্রায় সব ক্ষেত্রকে স্পর্শ করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আবেগ নয়, এই ভোটের আগে নাগরিকদের জানা দরকার তারা ঠিক কী বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন। কারণ একটি সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করতে পারে আগামীর বাংলাদেশের কাঠামো।
জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রের মূলনীতি
প্রস্তাবিত ৮৪ দফায় প্রথমেই রয়েছে নাগরিক পরিচয় 'বাংলাদেশি' হিসেবে স্বীকৃতি। রাষ্ট্রভাষা বাংলা রেখে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষাকে সাংবিধানিক সুরক্ষা ও মর্যাদা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রের মূলনীতিতে 'সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার'-এর সাথে 'ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি' যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের কথা বলা হয়েছে।
ক্ষমতার ভারসাম্য: রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করতে কোনো ব্যক্তি জীবনে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ (১০ বছর) প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন এমন প্রস্তাব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী একই সাথে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান বা দলীয় পদে থাকতে পারবেন না। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করা এবং প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দিতে পারবেন এমন ক্ষমতা প্রদানের প্রস্তাব রয়েছে।
জাতীয় সংসদ ও আইনসভা
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। নিম্নকক্ষে ৩০০ আসন এবং উচ্চকক্ষে ১০০ আসন থাকবে। সংরক্ষিত নারী আসন সরাসরি ভোটে নির্ধারণ, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন বাধ্যতামূলক করা এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া 'না' ভোটের বিধান ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে।
নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার
সংবিধানে 'নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার' ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন নিয়োগে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠন এবং নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধানের 'অপরিবর্তনযোগ্য' মৌলিক কাঠামো হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
বিচার বিভাগ
বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বাধীন সচিবালয়ের অধীনে আনা, স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন গঠন এবং বিচারকদের দলীয় আনুগত্য বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকে 'অসদাচরণ' হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রয়েছে।
মৌলিক অধিকার ও জরুরি অবস্থা
জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতার বদলে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারকে অলঙ্ঘনীয় করা এবং ইন্টারনেট ও ডিজিটাল অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। সংবিধানের বিতর্কিত ৭-ক ও ৭-খ অনুচ্ছেদ বাতিলের কথাও বলা হয়েছে।
আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার
স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা, দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া এবং সরকারি নিয়োগ ও কেনাকাটা শতভাগ ডিজিটালাইজড করার প্রস্তাব রয়েছে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদ বিবরণী জনসমক্ষে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে।
ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক সংস্কার
স্থায়ী ব্যাংকিং কমিশন গঠন, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের জন্য কঠোর শাস্তির আইন, পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ রাজধানীতে লিগ্যাল ইস্যু নিয়ে আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা
সুশাসন ও মানবাধিকার
ন্যায়পাল পদ সক্রিয় করা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পরিপন্থী সকল আইন সংস্কার, সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে নতুন ডেটা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং শক্তিশালী জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠনের প্রস্তাব রয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা ও পরিবেশ
সকল শ্রমিকের জন্য 'লিভিং ওয়েজ' নিশ্চিত করা, নদী ও বন রক্ষায় কঠোর পরিবেশ আইন বাস্তবায়ন, স্বাস্থ্য খাত সংস্কার এবং ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ নিশ্চিতের প্রস্তাব রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ভোট নয়, বরং রাষ্ট্র কাঠামো, সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও অর্থনীতিসহ বিস্তৃত সংস্কার প্রস্তাবের ওপর নাগরিকদের সরাসরি মতামত নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। প্রস্তাবিত ৮৪ দফার মধ্যে যেমন ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির বিষয় রয়েছে, তেমনি কিছু দফা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও আলোচনা-সমালোচনাও দেখা যাচ্ছে।
এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নাগরিকদের হাতে। 'হ্যাঁ' বা 'না'—যেকোনো একটিতে দেওয়া একটি সিলই নির্ধারণ করবে এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পথ খুলবে কি না। তাই ভোটের আগে বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং নিজস্ব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের ভূমিকা।