

মোঃ আব্দুল আলিম, রাজশাহী প্রতিনিধিঃ রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের ৭০ হাজার মানুষ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে মাত্র একজন ফার্মাসিস্টের ওপর ভরসা করে। ইউনিয়নের একমাত্র স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে নেই কোনো চিকিৎসক, নেই ওষুধ, নেই প্রয়োজনীয় জনবল। ফলে সাপে কাটা, প্রসব জটিলতা, সংক্রমণ কিংবা সাধারণ জ্বরেও রোগীদের নদী পেরিয়ে রাজশাহী শহরে যেতে হয়। সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে ঝরে যাচ্ছে প্রাণ, বাড়ছে জনভোগান্তি।
সম্প্রতি এই ইউনিয়নের ৫২৩ নম্বর গ্রামে বিষাক্ত সাপে কেটে মারা যান আসিফ আলী (৩৫)। পরিবারের সদস্যরা জানেন, কাছের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা মেলে না—এই বাস্তবতা মাথায় রেখে তারা সময় নষ্ট না করে নৌকায় রাজশাহী শহরের দিকে রওনা দেন। কিন্তু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই প্রাণ হারান আসিফ।
মৃত্যুবরণকারী আসিফের বাবা রেজাউল করিম বলেন, “আমার ছেলে বাশঝাড়ের পাশে শুয়ে ছিল। হঠাৎ সাপে কেটে দেয়। আমরা জানি এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো চিকিৎসা মেলে না। তাই সরাসরি শহরে রওনা হই। তবু বাঁচানো গেল না।” তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “চরে যদি চিকিৎসা মিলত, আমার আসিফ বেঁচে যেত।”
চর আষাড়িয়াদহ ইউনিয়নের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির অবস্থা ভয়াবহ। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ভবনের চারপাশে আগাছায় ভরা, দেয়ালে ফাটল, ভেতরে অন্ধকার—পরিচ্ছন্নতার লেশমাত্র নেই। পুরো কেন্দ্রে কর্মরত আছেন কেবল একজন ফার্মাসিস্ট মো. রুহুল আমিন। নেই চিকিৎসক, ওষুধ, নাইটগার্ড কিংবা পিয়ন।
ফার্মাসিস্ট রুহুল আমিন বলেন, “আমার একার পক্ষে এত মানুষের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়। এখানে একজন ডাক্তার, একজন পিয়ন, একজন নাইটগার্ড ও একজন মাঠকর্মী থাকার কথা, কিন্তু সব পদ শূন্য। ওষুধও জানুয়ারি পর্যন্ত ছিল, এরপর থেকে আর আসেনি।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতিমাসে মিটিংয়ে বললেও বলে ওষুধ চলে আসবে। কিন্তু গত ৬ মাসে কিছুই আসেনি। যত ওষুধ দরকার, তার ১০ ভাগও সরবরাহ হয় না।”
আরও পড়ুনঃ সাজিদ হত্যাকাণ্ডে পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের
স্থানীয় বাসিন্দা আয়েশা খাতুন বলেন, “জ্বর হলে বা সামান্য সমস্যা হলেও নদী পার হয়ে শহরে যেতে হয়। এই নামে-ভারে কমপ্লেক্স রেখে লাভ কী?”
আব্দুল্লাহীল কাফি নামের আরেকজন বলেন, “আমাদের চরবাসী যেন বনের পশুর মতো বাস করি। চিকিৎসা, শিক্ষা—সবকিছুতেই পিছিয়ে।”
শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ বলেন, “শুধু একটা নদীর কারণে আমরা আধুনিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্ছিন্ন। স্বাস্থ্যসেবার এই দারিদ্র্য দুর্ভাগ্যজনক।”
চর আষাড়িয়াদহের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুল ইসলাম ভোলা বলেন, “এই কমপ্লেক্স থেকে কোনো সেবা পাওয়া যায় না। সমস্যাটা বহুদিনের। প্রশাসন জানলেও কার্যকর উদ্যোগ নেই।”
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ৭০ হাজার মানুষের জন্য নির্মিত এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি মূলত ছিল একটি প্রসূতি সহায়তা কেন্দ্র (সিডব্লিউ), যা বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে অকেজো। পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কার্যক্রমও ছয় মাস ধরে বন্ধ।
রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জন ডা. এস.আই.এম. রাজিউল করিম বলেন, “চর আষাড়িয়াদহে আমাদের কোনো স্থায়ী স্বাস্থ্য অবকাঠামো নেই, ফলে চিকিৎসক বা ওষুধ দেওয়ার সুযোগও নেই। তবে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে, নতুন স্থাপনা অনুমোদন পেলেই চিকিৎসক ও ওষুধ দেওয়া সম্ভব হবে।”
চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার। অথচ রাজশাহীর এই চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ বছরের পর বছর ধরে চিকিৎসাবঞ্চিত, চিকিৎসার অভাবে হারাচ্ছে জীবন। এখন প্রশ্ন, কত প্রাণ ঝরলে মিলবে একটি স্থায়ী স্বাস্থ্যব্যবস্থা?