

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার যেটি যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার (মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার) নামে পরিচিত তার থেকে আদায় করা টোলের টাকার ভাগ ৯ মাস ধরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে (ডিএসসিসি) দিচ্ছে না ওরিয়ন গ্রুপ।
কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে যানবাহন না চলার অজুহাত দেখিয়ে গত বছরের মে মাস থেকে প্রায় ২৮০ দিন ধরে (চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) সিটি করপোরেশনকে কোনো টাকা দেয়নি তারা।
এমন ঘটনা অবশ্য নতুন নয়, এর আগে একই কারণ দেখিয়ে প্রায় সাড়ে ৬ বছরেরও বেশি সময় সরকারকে রাজস্ব দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এশিয়া পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে আরও তুলে ধরা হয়...
বকেয়া শোধ না করেই মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন
ডিএসসিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ফ্লাইওভার চালুর পর গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ হাজার ১৫৭ দিনের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৭৬৫ দিনের টোলের ভাগ সিটি করপোরেশনকে দিয়েছে ওরিয়ন। ইক্যুয়িটি বেনিফিট শেয়ার হিসেবে এ টাকা পরিশোধ করলেও বাকি ২ হাজার ৩৯২ দিনের টোলের টাকার কোনো ভাগ সিটি করপোরেশনকে দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।
কম যানবাহন চলাচলের কথা বলে টোলের ভাগ বন্ধ রাখার পাশাপাশি আরও দুই হাজার ৩৪ দিনের জন্য (৫ বছর ৬ মাস ২৮ দিন) চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদনও জানিয়েছে ওরিয়ন।
ডিএসসিসির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগ বলেন, তাদের লিখিত ও মৌখিকভাবে করপোরেশনের বকেয়া টাকা পরিশোধের জন্য বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির কোনো সাড়া নেই।
১১ বছরে মাত্র ৪০ কোটি টাকা
দেশের প্রথম টোলভিত্তিক পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প হিসেবে নির্মাণ করা হয় যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার। ২০১৩ সালের ১৩ অক্টোবর দেশের দীর্ঘতম এই ফ্লাইওভারে যান চলাচল শুরু হয়। শুরু থেকেই চলছে টোল আদায়। শুরু থেকেই ফ্লাইওভারের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করছে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড।
ডিএসসির রাজস্ব বিভাগের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ইক্যুইটি শেয়ার বেনিফিট হিসেবে সিটি করপোরেশনকে সবমিলিয়ে মাত্র ৪০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে ওরিয়ন। এরপর থেকে ফের লভ্যাংশ দেওয়া বন্ধ রেখেছে তারা।
অসম চুক্তির সুযোগ নিচ্ছে ওরিয়ন
ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, ফ্লাইওভার দিয়ে কতটি বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যান গেলে করপোরেশন রাজস্ব পাবে এটি সিটি করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তির সময় সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়নি। আমি মনে করি, সে সময়ের চুক্তিটিই ভালোভাবে হয়নি, এটি ছিল অসম চুক্তি।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের হিসাব বলছে, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারে প্রতি ঘণ্টায় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলে ৮ থেকে ১০ হাজার। এক দিনে গাড়ি চলে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার। সে হিসেবে টোল আদায় হওয়ার কথা বছরে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। আর ওরিয়ন হিসাব দিচ্ছে বছরে ১৪০ কোটি থেকে ১৭৮ কোটি টাকার।
তদন্তে বহু অনিয়মের তথ্য
চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন পাওয়ার পর গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভারে গাড়ি চলাচলের প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটনের জন্য ডিএসসিসির প্রধান সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। গত ১১ নভেম্বর কমিটির পক্ষ থেকে একটি প্রতিবেদন করপোরেশনে জমা দেওয়া হয়।
আরও পড়ুনঃ ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট: ৮৪ দফা প্রস্তাবে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা
প্রতিবেদনে বলা হয়, টোল আদায়ের স্লিপ প্রস্তুত এবং বিকাশে টোল পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে ওরিয়ন সিটি করপোরেশনের মতামত নেয়নি। টোল প্লাজার স্লিপের মাধ্যমে মাসিক রিপোর্টে টোলপ্লাজার নাম, কাউন্টার নাম্বারের বিপরীতে সিরিয়াল নম্বর ও গাড়ির ধরন উল্লেখ না থাকায় গাড়ির সংখ্যা ও টোল আদায়ের স্বচ্ছতাও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কমিটির আহ্বায়ক মোবাশ্বের হোসেন বলেন, সে সময় যারা করপোরেশনের দায়িত্বে ছিলেন তারা জেনে বা না বুঝেই একটি অসম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। ফ্লাইওভারের টোল আদায়ের মনিটরিং সিটি করপোরেশনের আয়ত্তে রাখার কথা থাকলেও সেটি সুবিধাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়া হয়েছে।
পাঁচ নির্দেশনা মন্ত্রণালয়ের
ওরিয়নের মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন বিবেচনার স্বার্থে কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ডিএসসিসিকে পাঁচটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে রয়েছে নিরপেক্ষ অডিটর নিয়োগ, ওরিয়ন কর্তৃক যানবাহন চলাচলের ডেটাবেস ও ড্যাশবোর্ড অ্যাক্সেস করপোরেশনকে প্রদান, মনিটরিং সেল গঠন এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর তথ্য ব্যবস্থার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
জানা যায়, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ওরিয়ন ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড গ্রুপের বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান ওবাইদুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।





