

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-এর মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ ক্রমেই বিস্তার লাভ করছে। সাম্প্রতিক কয়েকদিনে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ, ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ, কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় উভয়পক্ষের বহু নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।
সংঘাতের সূত্রপাত হিসেবে ছাত্রদলের ‘গুপ্ত’ লেখা কর্মসূচি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ পোস্ট ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগকে সামনে আনা হলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মূলত ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারই এ সংঘাতের বড় কারণ। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।
এ সংঘাতকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ও পাল্টা বিক্ষোভের ঘটনা ঘটছে, যা শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে এবং জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শিক্ষাবিদদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছাত্রসংগঠনগুলোর সহনশীল আচরণ এবং প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। ড. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন পর পাওয়া গণতান্ত্রিক পরিবেশ ধরে রাখতে হলে সহনশীলতা বাড়াতে হবে এবং অসহিষ্ণু আচরণ বন্ধ করতে হবে।
সূত্রমতে, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে দেয়ালে ‘গুপ্ত’ শব্দ লেখা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যেখানে উভয়পক্ষের মধ্যে ধারালো অস্ত্র ও লাঠিসোঁটার ব্যবহার দেখা যায় এবং অন্তত ২০ জন আহত হন। পরবর্তীতে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরও বিক্ষোভ ও পাল্টা কর্মসূচি সংঘটিত হয়।
একই দিন কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন। অন্যদিকে, ঢাকায় শাহবাগ এলাকায় সংঘর্ষের জেরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-এর দুই নেতার ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে এবং অন্তত ১০ জন সাংবাদিক আহত হন।
এদিকে পাবনার ঈশ্বরদী সরকারি কলেজে সংঘর্ষের সময় গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়।
ঘটনাগুলোর পর উভয় সংগঠনের পক্ষ থেকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করা হয়েছে। ছাত্রশিবিরের নেতারা অভিযোগ করেছেন, পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হচ্ছে, অন্যদিকে ছাত্রদল দাবি করেছে, সংঘাত উসকে দিচ্ছে ছাত্রশিবির।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে নিষিদ্ধ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-এর কিছু অপতৎপরতার অভিযোগও সামনে এসেছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণা পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ দেশের দিকে ধেয়ে আসছে বৃষ্টি বলয় ‘ঝুমুল’
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন।
এদিকে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির সাম্প্রতিক ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ উল্লেখ করে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। অপরদিকে ছাত্রশিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম দাবি করেছেন, তারা সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে চায়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চলমান উত্তেজনা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংলাপ অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।