spot_img

― Advertisement ―

spot_img

রাষ্ট্র সংস্কার ও শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনের বার্তা দিয়ে জামাতের ইশতেহার

নির্বাচনী ইশতেহারে জামাতের অঙ্গীকার পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র সংস্কার ও শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন। প্রকাশিত দলীয় ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামো থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা,...
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকইরানের মরুভূমিতে ডেল্টা ফোর্সের দুঃস্বপ্ন: মার্কিনিদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা

ইরানের মরুভূমিতে ডেল্টা ফোর্সের দুঃস্বপ্ন: মার্কিনিদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গোপন, দুর্ধর্ষ ও ভয়ংকর বিশেষ বাহিনী হিসেবে পরিচিত ডেল্টা ফোর্স। বিশ্বজুড়ে বহু অভিযানে নিখুঁত সাফল্যের কারণে এই বাহিনীকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের কিংবদন্তি। তবে সেই গর্বের আড়ালেই রয়েছে একটি ভয়াবহ অধ্যায়, যেখানে কোনো শত্রুপক্ষের গুলিই নয়, প্রকৃতি, ভুল পরিকল্পনা ও সমন্বয়হীনতাই রচনা করেছিল ডেল্টা ফোর্সের কবর। সেই অধ্যায়টির নাম— ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’।

১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পর তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দখল করে বিপ্লবী ছাত্ররা। সেখানে আটক হন ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মী। ঘটনাটি বিশ্বজুড়ে তীব্র আলোড়ন তোলে। ক্ষমতাচ্যুত শাহ মোহাম্মদ রেজা পেহলভিকে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে এই সংকট তৈরি হয়। ইরানের নতুন নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি শাহকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। কয়েক মাস ধরে কূটনৈতিক চেষ্টা ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের ওপর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার চাপ চরমে পৌঁছে।

এই প্রেক্ষাপটে গোপনে অনুমোদন দেওয়া হয় একটি উদ্ধার অভিযান। পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ডেল্টা ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল চার্লি বেকউইথ। এতে যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার ফোর্স, নেভি ও মেরিন কর্পসের বিশেষ ইউনিট একত্রে অংশ নেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী সি-১৩০ পরিবহন বিমান ও আরএইচ-৫৩ডি সি স্ট্যালিয়ন হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ইরানের ভেতরে প্রবেশ করে প্রথমে একটি গোপন মরুভূমি ঘাঁটিতে অবস্থান নেওয়ার কথা ছিল, যার সাংকেতিক নাম ছিল ‘ডেসার্ট ওয়ান’। সেখান থেকে পরদিন রাতে তেহরানে ঢুকে দূতাবাসে অভিযান চালানোর কথা ছিল।

১৯৮০ সালের ২৪ এপ্রিল রাতে শুরু হয় অভিযান। বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস নিমিটজ ও মধ্যপ্রাচ্যের একটি বিমানঘাঁটি থেকে আটটি হেলিকপ্টার এবং কয়েকটি সি-১৩০ বিমান আরব সাগর পেরিয়ে প্রায় ৬০০ মাইল পথ অতিক্রম করে ইরানের মরুভূমির দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু শুরু থেকেই বিপর্যয় নেমে আসে। পথে ভয়াবহ মরু ঝড় বা ‘হাবুব’-এর কবলে পড়ে একাধিক হেলিকপ্টার। যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়ে দুটি হেলিকপ্টার মাঝপথেই ফিরে যেতে বাধ্য হয়। বাকি ছয়টি নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে ডেসার্ট ওয়ানে পৌঁছায়।

ডেসার্ট ওয়ানে পৌঁছানোর পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। সেখানে আরও একটি হেলিকপ্টার অকেজো হয়ে পড়ে। অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ছয়টি হেলিকপ্টার না থাকায় পুরো পরিকল্পনাই ভেস্তে যাওয়ার মুখে পড়ে। বালুঝড়ের কারণে দৃশ্যমানতা ছিল ভয়াবহ রকমের খারাপ। অভিযানে অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা পরে জানান, ৩০০ ফুট উচ্চতায় থেকেও তারা ভূমি দেখতে পাচ্ছিলেন না, দিকনির্দেশনা হারিয়ে ফেলেছিলেন সবাই।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টারা অভিযান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু প্রত্যাহারের সময় ঘটে যায় সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। একটি আরএইচ-৫৩ডি হেলিকপ্টার মরুভূমিতে থাকা জ্বালানি বহনকারী একটি সি-১৩০ বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে। মুহূর্তেই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে এবং উভয় আকাশযান আগুনে পুড়ে যায়। এতে পাঁচজন বিমানবাহিনীর সদস্য ও তিনজন মেরিনসহ মোট আটজন মার্কিন সেনা নিহত হন।

দুর্ঘটনার পর বাকি সেনাদের দ্রুত ইরান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে তাড়াহুড়োর কারণে ফেলে যেতে হয় হেলিকপ্টার, অস্ত্র, মানচিত্র এবং নিহত সহযোদ্ধাদের মৃতদেহ। এই ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয় এবং সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাই ১৯৮০ সালের নির্বাচনে জিমি কার্টারের পরাজয়ের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুনঃ ফুলবাড়ী সীমান্তে বিএসএফের পাকা সড়ক নির্মাণের চেষ্টা, বিজিবির বাধা

ইরানের পক্ষ থেকে এই ব্যর্থতাকে ঐশী শাস্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। আয়াতুল্লাহ খোমেনি বলেন, ইরানের ভূখণ্ডে আগ্রাসনের শাস্তি হিসেবেই আল্লাহ বালুঝড় পাঠিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, কার্টার নির্বাচনী স্বার্থে এই অভিযান চালিয়েছিলেন।

সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল এক বড় শিক্ষা। এই ব্যর্থতার পর বিশেষ অভিযানে সমন্বয়হীনতা দূর করতে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সংস্কার আনে এবং পরবর্তীতে গঠন করা হয় ইউএস স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড। দীর্ঘ ৪৪৪ দিন পর, ১৯৮১ সালের ২০ জানুয়ারি রোনাল্ড রিগ্যানের শপথ গ্রহণের দিন অবশেষে ইরানে আটক মার্কিন জিম্মিরা মুক্তি পান।

আজও ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’ ডেল্টা ফোর্সের ইতিহাসে এক করুণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়—যেখানে কোনো শত্রুর গুলিতে নয়, ভুল পরিকল্পনা, প্রকৃতি ও আত্মবিশ্বাসের অতিরিক্ত ভারেই মুখ থুবড়ে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ভয়ংকর বিশেষ বাহিনী।