spot_img

― Advertisement ―

spot_img

মার্কেট দখল, ভাড়া বাণিজ্য, মাদক আড্ডা—স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ

মোঃ সাকিবুল ইসলাম স্বাধীন, রাজশাহী প্রতিনিধিঃ রাজশাহী মহানগরীর বহরমপুর এলাকায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির একটি মার্কেট দখল করে রাখার...
প্রচ্ছদসারা বাংলামার্কেট দখল, ভাড়া বাণিজ্য, মাদক আড্ডা—স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ

মার্কেট দখল, ভাড়া বাণিজ্য, মাদক আড্ডা—স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ

মোঃ সাকিবুল ইসলাম স্বাধীন, রাজশাহী প্রতিনিধিঃ রাজশাহী মহানগরীর বহরমপুর এলাকায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির একটি মার্কেট দখল করে রাখার অভিযোগ উঠেছে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত মো. ইব্রাহিম নিজেও রামেক হাসপাতালের একজন কর্মচারী এবং তিনি রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নগরীর ঐতিহ্য চত্বরের পাশে বহরমপুর এলাকায় অবস্থিত ছোট এই মার্কেটটিতে প্রায় পাঁচটি দোকান রয়েছে। মার্কেটটি মূলত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির আওতাধীন। তবে অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের অন্যান্য কর্মচারী কিংবা প্রশাসনের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই মার্কেটটি দখল করে নিয়েছেন ইব্রাহিম।

হাসপাতাল সূত্রে আরও জানা গেছে, হাসপাতাল প্রশাসনও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয় যে মার্কেটটি রামেক হাসপাতালের আওতাধীন সম্পত্তি।

বিষয়টি জানতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারা জানান, পরিচালক দপ্তরের মিডিয়া সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. শঙ্কর কে. বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

পরে ডা. শঙ্কর কে. বিশ্বাসের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই বিষয়ে আমার জানা নেই। ওই মার্কেটটি মেডিকেলের আওতাধীন কি না সেটাও নিশ্চিত নই। আগামীকাল বিষয়টি খোঁজ নিয়ে জানাতে পারব।” পরে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মার্কেটটি দখল করে সেখানে নিজস্ব কার্যালয় করেছেন ইব্রাহিম। রাতে সেখানে দীর্ঘ সময় আড্ডা চলে এবং মাদকসেবীদেরও আসা–যাওয়া রয়েছে। এ কারণে এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি বাসিন্দাদের।

এ ঘটনায় এলাকার বাসিন্দারা রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের কাছে একটি স্মারকলিপিও দিয়েছেন। স্মারকলিপিতে তারা উল্লেখ করেন, মো. ইব্রাহিম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক পরিচয়ে সরকারি স্থাপনা দখল করে কিছু টোকাই ও মাদকসেবী যুবকদের নিয়ে এলাকায় মাদক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। রাত হলে এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ করা হয়। এ অবস্থায় এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এবং নিয়মিত পুলিশি অভিযান পরিচালনার দাবি জানান স্থানীয়রা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মার্কেটের সামনে বিএনপির রাজপাড়া থানা কার্যালয়ের একটি ব্যানার ঝুলছে। সেখানে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে ব্যানারও টানানো হয়েছে। মার্কেটের একটি সেলুন দোকান ইব্রাহিম নিজেই ভাড়া দিয়েছেন এবং সেখান থেকে প্রতি মাসে ভাড়া আদায় করছেন বলে স্থানীয়রা জানান।

স্থানীয়দের ভাষ্য, এর আগে ওই স্থানে বিআরটিসির বাস কাউন্টার ছিল। পরে ফ্লাইওভারের কাজ চলমান থাকায় কাউন্টারগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। তখন ফাঁকা পড়ে থাকা মার্কেটটি দখল করে নেন ইব্রাহিম। এর আগেও ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে নাসিরুল ইসলাম রঞ্জু নামের এক ব্যক্তির বাড়ি দখলের অভিযোগ ওঠে। 

এছাড়াও তার বেপরোয়া কর্মকাণ্ড, দখলবাজি ও মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ততার একাধিক এলাকার বাসিন্দারা অতিষ্ঠ ইব্রাহিমের বিষয়ে। স্থানীয়রা জানান, বহরমপুর ও ডাসমারি আইডি বাগানপাড়া এলাকার কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীকে তিনি আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব মাদক ব্যবসায়ীর কেউ সাপ্তাহিক আবার কেউ মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা দিয়ে থাকেন। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর তারা ইব্রাহিমের চেম্বারে এসে ওই চাঁদা পৌঁছে দেন বলেও দাবি করেন এলাকাবাসী।

অভিযোগ রয়েছে, দলীয় কার্যালয় করার উদ্দেশ্যে বাড়িটি দখল করা হয়। এ ঘটনায় রঞ্জু থানায় অভিযোগ দিলে বর্তমানে বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।

নাসিরুল ইসলাম রঞ্জু বলেন, “ওই সময় তারা অস্ত্র নিয়ে আমার বাসায় ঢুকে আসবাবপত্র লুট করে নেয়। বাসা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করে। আমাকে সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। এর নেতৃত্ব দেয় ইব্রাহিম নিজেই। ৫ আগস্টের পর সে আরও বেপরোয়া হয়ে গেছে। মামলা করার পর থেকে তারা আমাকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছে এবং মারধরও করেছে।”

এদিকে, এ বিষয়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলে ইব্রাহিম একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। তবে স্থানীয়দের দাবি, সংবাদ সম্মেলনটি ছিল পরিকল্পিত।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করার সময় ইব্রাহিম বারবার আটকে যাচ্ছিলেন এবং বক্তব্যের কিছু অংশ পড়তে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। সেখানে তিনি দাবি করেন, বিএনপির যে কার্যালয়টি খোলা হয়েছে সেটি সালাউদ্দিন নামের একজন ব্যক্তি খুলেছেন।

তবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সালাউদ্দিন বিএনপির কোনো নেতা নন। তিনি আগে যুবলীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তার ভাই সালেক যুবলীগের সহসভাপতি ছিলেন বলেও দাবি করেন এলাকাবাসী।

অভিযোগের বিষয়ে সালাউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিএনপির কোনো পদে আছেন কি না তা স্পষ্ট করেননি। বিএনপি কার্যালয় খোলার জন্য মহানগর বা থানা কমিটির অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নের জবাবও দেননি। তিনি বলেন, “এ বিষয়ে ইব্রাহিমের সঙ্গে কথা বলুন, তিনি বিস্তারিত বলতে পারবেন।” পরে তিনি ফোন কেটে দেন এবং আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে সরেজমিনে ইব্রাহিমের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “সংবাদ সম্মেলনটা লিখিত না করে মুখে বললেই ভালো হতো। আমি আমার এক সাংবাদিক বন্ধুকে দিয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করতে বলেছিলাম। তার বন্ধুই স্ক্রিপ্ট লিখে দিয়েছিল। এজন্য পড়তে একটু সমস্যা হয়েছে।”

আরও পড়ুনঃ ইবি শিক্ষিকা হত্যায় শিক্ষকদের রহস্যজনক নিরবতার সমালোচনা

তিনি সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিলেন, তার কাছে অন্তরের আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিটিং–মিছিলে অংশ নেওয়ার ছবি রয়েছে। তবে সে ছবি দেখাতে পারেননি। দেখিয়েছে অন্তরের বন্ধু যিনি নাকি ছাত্রলীগের সাথে হয়তো জড়িত ছিলেন তার জন্মদিনে কেক কাটার সময় উপস্থিত থাকা ছবি। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের এক সিনিয়র নেতার বিরুদ্ধেও কটূক্তি করেন। 

এ বিষয়ে রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “রাজশাহীতে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল একটি পরিচ্ছন্ন সংগঠন হিসেবে কাজ করে আসছে। বিগত সময় থেকে এবং ৫ আগস্টের পরেও আমরা শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ করে চলছি। কেউ যদি স্বেচ্ছাসেবক দলের নাম ভাঙিয়ে কোনো অপকর্ম করে, তার দায় সংগঠন নেবে না। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসানকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এছাড়াও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালটিতে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের পর পরবর্তী প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।