

‘সংযোগে স্থিতি, সহনশীলতায় শক্তি’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য আয়োজনে পালিত হয়েছে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে রোববার রাজধানীর বিটিআরসি ভবন-এর প্রধান সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা, সেমিনার ও প্রযুক্তি মেলার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সরকারের নীতিনির্ধারক, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, টেলিযোগাযোগ খাতের উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বর্তমান সরকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে। তিনি জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), হার্ডওয়্যার, সেমিকন্ডাক্টর, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা সেন্টার, স্টার্টআপ এবং ডিজিটাল সেবাকে ঘিরে বাংলাদেশকে প্রযুক্তি উৎপাদন ও রপ্তানিতে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে সরকার কাজ করছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমানে দেশে মোবাইল ফোন সংযোগের সংখ্যা ১৮ দশমিক ৮৪ কোটিতে পৌঁছেছে এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৩৬ কোটিতে। দেশের ৯৯ শতাংশ জনগোষ্ঠী এখন ৪জি নেটওয়ার্কের আওতায় এসেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দেশের মধ্যে রয়েছে। তিনি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্বমানের ৫জি নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী ফাইবার অপটিক অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একইসঙ্গে “এক নাগরিক, এক ওয়ালেট, এক আইডি” এবং জাতীয় ডেটা ব্যাংক গঠনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। সরকারি সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আরও সম্প্রসারণ করা হবে বলেও জানান।
ফারজানা শারমীন তার বক্তব্যে বলেন, ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থায় নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন অল্প সময়ের মধ্যেই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তিনি দেশের বিমানবন্দরগুলোতে আধুনিক ডিজিটাল সেবা এবং ওয়াই-ফাই সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় টেলিযোগাযোগ ও ডিজিটাল খাতের বিকাশে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি সেবার মান ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ ডিজিটাল সেবাদানকারী দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব কাজী আনোয়ার হোসেন বলেন, দুর্যোগের সময়ে একটি মোবাইল বার্তাও একটি জীবন বাঁচাতে পারে। তিনি ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, সাইবার নিরাপত্তা, পেপারলেস প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট ডাটা ও আইওটি প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্য দেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব মিজ্ বিলকিস জাহান রিমি। তিনি বলেন, ডিজিটাল সংযোগ এখন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, এআই, আইওটি, ৫জি, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ডেটা প্রযুক্তি আগামী দিনের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-এর চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারী। তিনি জানান, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ কিলোমিটার ফাইবার অপটিক সাবমেরিন ক্যাবল বিস্তৃত রয়েছে, যার মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ ডাটা ট্রাফিক সম্পন্ন হয়।
আরও পড়ুনঃ হত্যা মামলায় আইভীর জামিন বহাল, মুক্তিতে বাধা নেই
দিবসটি উপলক্ষে এক ভিডিও বার্তায় International Telecommunication Union-এর মহাসচিব ডোরিন বোগডান-মার্টিন বলেন, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক এখন মানুষের জন্য জীবনরেখায় পরিণত হয়েছে। তিনি শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ টেলিযোগাযোগ ও আইসিটি খাতের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
দিবসটি উপলক্ষে তিনটি বিভাগে অনলাইন রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় এবং বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি ১৭ ও ১৮ মে দুই দিনব্যাপী বিটিআরসি প্রাঙ্গণ-এ টেলিকম ও প্রযুক্তি মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলায় মোবাইল অপারেটর, মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, টাওয়ার কোম্পানি, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার, আইসিএক্স, আইআইজি এবং বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড-সহ প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট ৩০টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে।
উল্লেখ্য, ১৮৬৫ সালের ১৭ মে International Telecommunication Union প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে ১৭ মে-কে বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১৯৪টি সদস্য দেশে দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় উদযাপিত হচ্ছে।