
শেখ মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, সাভার প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম সুশৃঙ্খল নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬–এর জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ না করায় তাদের সমর্থকদের একটি বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে অনুপস্থিত থাকলেও ভোটার উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। অতীতের মতো সহিংসতা, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট বা ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ এ নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে কম শোনা গেছে বলে জানা গেছে।
তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সারা দেশে নির্বাচনী আমেজ ছিল স্পষ্ট। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর মধ্যে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান–কে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। দুই নেতার জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্ব নিয়ে জনমনে আগ্রহও ছিল লক্ষণীয়।
বিভিন্ন জরিপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াত-সমর্থিত জোট সরকার গঠনে এগিয়ে রয়েছে—এমন পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও চূড়ান্ত ফলাফলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে বিএনপি। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চসংখ্যক আসন পেলেও একশ’র নিচে থেকে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে দেশে একটি স্থিতিশীল ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় থাকবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন অনেকে।
তবে জরিপে এগিয়ে থেকেও ফলাফলে পিছিয়ে পড়ার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও ফলাফল প্রকাশে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে এগারো দলীয় জোট। প্রায় ৭০টি আসনে ব্যবধান পাঁচ হাজার ভোটের মধ্যে থাকায় এসব আসনে ‘সূক্ষ্ম ইঞ্জিনিয়ারিং’ হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। এর মধ্যে ২০ থেকে ২৫টি আসনে তথ্য-প্রমাণ নিয়ে আইনি লড়াইয়ের ঘোষণাও দিয়েছেন জোটের নেতারা। শেষ পর্যন্ত এ নিয়ে নতুন কোনো রাজনৈতিক অধ্যায় রচিত হয় কি না, তা এখন সময়ই বলে দেবে।
আরও পড়ুনঃ তারেক রহমান ঢাকা-১৭ রাখছেন, বগুড়া-৬ শূন্য ঘোষণা হবে
জামায়াতে ইসলামী কেন প্রত্যাশিত ফল পায়নি—এ প্রশ্নে কয়েকটি কারণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে। দলটির দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান প্রশাসনের একাংশের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আবার সমাজের এলিট শ্রেণির একটি অংশ জামায়াতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে বলেও বিশ্লেষকদের মত। অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যেও দলটির বার্তা প্রত্যাশিতভাবে পৌঁছায়নি—এমন মন্তব্য রয়েছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমে যথেষ্ট সমর্থন না পাওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সব মিলিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এখন দৃষ্টি আগামীর দিকে—নতুন সরকার কতটা কার্যকরভাবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে এবং বিরোধী দল সংসদে কতটা গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। দেশবাসী একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ দেখতে চায়—এমন প্রত্যাশাই এখন সর্বত্র।



