
রাত গভীর হয়। মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসে তেলাওয়াতের সুর। ঘরে ঘরে জায়নামাজে বসে মানুষ — চোখে জল, হাত তোলা আসমানের দিকে। রমজানের শেষ দশ রাত এলেই মুসলিম হৃদয়ে এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা জাগে। কারণ এই রাতগুলোর কোনো একটিতে লুকিয়ে আছে সেই মহিমান্বিত মুহূর্ত — লাইলাতুল কদর। যে রাতের মর্যাদা হাজার মাসের চেয়েও বেশি।
শুধু একটি রাত নয়, একটি জীবন
‘লাইলাতুল কদর’ — আরবি এই শব্দগুচ্ছের অর্থ বহুমাত্রিক। ‘লাইলাতুন’ মানে রাত্রি, আর ‘কদর’ শব্দে একাধিক অর্থ মিলেমিশে আছে। এর একটি অর্থ মর্যাদা ও সম্মান — এই রাত মহিমান্বিত। আরেকটি অর্থ নির্ধারণ — এই রাতে আল্লাহ সারা বছরের তাকদির লিখে দেন। তৃতীয় অর্থ সংকীর্ণতা — কারণ এই রাতে এত ফেরেশতা পৃথিবীতে নেমে আসেন যে মাটি যেন সংকুচিত হয়ে পড়ে।
বাংলায় আমরা বলি ‘শবে কদর’। ফারসি ‘শব’ অর্থ রাত। অর্থাৎ — মর্যাদার রাত।
গণিতের হিসাবে এক হাজার মাস মানে প্রায় ৮৩ বছর। একজন মানুষের গোটা জীবনের ইবাদতের সমতুল্য সওয়াব মিলতে পারে মাত্র একটি রাতে। এই সম্ভাবনাই এই রাতকে করে তোলে অতুলনীয়।
কুরআনের পাতায় এক পূর্ণ সূরা
এই রাতের গুরুত্ব এতটাই গভীর যে মহান আল্লাহ তাআলা স্বয়ং এই নিয়ে একটি পূর্ণ সূরা নাজিল করেছেন। সূরা আল-কদরে আল্লাহ বলেন —
“নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) লাইলাতুল কদরে নাজিল করেছি। আর আপনি কি জানেন লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতারা এবং রূহ (জিবরাইল আ.) তাদের পালনকর্তার অনুমতিক্রমে প্রতিটি কাজে অবতরণ করে। সেই রাত শান্তিময় — ফজরের উদয় পর্যন্ত।” — সূরা আল-কদর, আয়াত ১-৫
সূরা আদ-দুখানেও আল্লাহ এই রাতকে ‘লাইলাতুম মুবারাকা’ বা বরকতময় রাত বলে উল্লেখ করেছেন।
যে রাত খুঁজতেন নবী (সা.) নিজে
রাসূলুল্লাহ (সা.) শুধু উম্মতকে নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি — নিজেও রমজানের শেষ দশ দিন এমনভাবে ইবাদতে ডুবে যেতেন, যেমন বছরের অন্য কোনো সময় করতেন না। হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন —
“রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ দশ রাতে তাঁর লুঙ্গি শক্ত করে বেঁধে নিতেন, রাত জেগে থাকতেন এবং তাঁর পরিবারকেও জাগাতেন।” — সহিহ বুখারি: ২০২৪; সহিহ মুসলিম: ১১৭৪
প্রতি বছর রমজানের শেষ দশ দিন তিনি মসজিদে ইতিকাফে বসতেন। মৃত্যু পর্যন্ত এই অভ্যাস তিনি ছাড়েননি। তাঁর ইন্তেকালের পরে তাঁর স্ত্রীরাও এই সুন্নত জারি রেখেছিলেন।
কোন রাতে? রহস্য রয়ে গেছে ইচ্ছাকৃতভাবেই
লাইলাতুল কদর ঠিক কোন রাত — এই প্রশ্নের উত্তর জেনেবুঝেই লুকিয়ে রাখা হয়েছে। একটি হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এই রাতের কথা জানাতে আসছিলেন, কিন্তু দুই সাহাবির মধ্যে ঝগড়া হওয়ায় সেই জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া হয়। নবী (সা.) বললেন — “হয়তো এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর।”
কারণ স্পষ্ট — নির্দিষ্ট রাত জানা থাকলে মানুষ হয়তো শুধু সেই একটি রাতেই ইবাদত করত। কিন্তু অনিশ্চয়তার কারণে একজন প্রকৃত মুমিন পুরো দশটি রাত জেগে থাকতে অনুপ্রাণিত হন।
তবে সহিহ হাদিসের আলোকে আলেমগণ বলেন —
- রমজানের শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতগুলোতে এই রাত খুঁজতে হবে — বিশেষত ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাত।
- ২৭তম রমজানের রাত সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় বলে অধিকাংশ আলেম মনে করেন।
রাতটি চেনার উপায়
হাদিসে লাইলাতুল কদরের দুটি বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়েছে —
প্রথমত, রাতটি হবে অদ্ভুত শান্তিময় — না অতিরিক্ত গরম, না অতিরিক্ত ঠান্ডা।
দ্বিতীয়ত, সেই রাতের পর ভোরে সূর্য উঠবে কিরণ ছাড়া — নরম, হালকা আলোয়, যেন একটি থালার মতো। হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা.) এই বর্ণনাটি রাসূল (সা.)-এর কাছ থেকে সরাসরি শুনেছেন। (সহিহ মুসলিম: ৭৬২)
এই রাতে যা করবেন
সহিহ সুন্নাহর আলোকে এই রাতের জন্য বিশেষভাবে যে আমলগুলো করা উচিত —
নফল নামাজ: তাহাজ্জুদ ও তারাবিতে দীর্ঘ সময় দিন।
কুরআন তেলাওয়াত: এই রাতেই কুরআন প্রথম অবতীর্ণ হয়েছিল। তেলাওয়াতের সঙ্গে এই সংযোগটি মনে রাখুন।
বিশেষ দোয়া: হযরত আয়েশা (রা.) একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন — হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি এই রাত পাই, কী দোয়া পড়ব? নবী (সা.) বললেন, পড়বে —
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
“হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই তুমি ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা করতে ভালোবাসো। তাই আমাকে ক্ষমা করে দাও।” — তিরমিযি: ৩৫১৩; ইবনে মাজাহ: ৩৮৫০
জিকির ও ইস্তিগফার: অধিক পরিমাণে আল্লাহর নাম স্মরণ করুন।
দান-সদকা: এই রাতে দান করলে সওয়াব বহুগুণ বেড়ে যায়।
আরও পড়ুনঃ কুরবানির গরু কেমন হতে হবে? ইসলাম কী বলে?
যে বঞ্চিত হলো — সে হারাল সব
রাসূলুল্লাহ (সা.) এই রাতের ব্যাপারে যতটা আশাবাদী ছিলেন, ততটাই কঠোর ছিলেন অবহেলার প্রশ্নে। হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, নবী (সা.) বলেছেন —
“যে ব্যক্তি রমজান মাস পেয়েও তার গুনাহ মাফ করাতে পারল না, সে দূরে সরে গেল।” — ইবনে মাজাহ: ১৬৪১
হাজার মাসের সমতুল্য একটি রাত হেলায় পার করে দেওয়া — তার চেয়ে বড় ক্ষতি একজন মুমিনের জীবনে আর কী হতে পারে?
রাত জাগুক ইবাদতে
লাইলাতুল কদর শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়। এটি প্রতিটি রমজানে ফিরে আসে — প্রতিটি মুমিনের দরজায় নক করে। কে সাড়া দেবে, কে ঘুমিয়ে থাকবে — সেটা সম্পূর্ণ তার নিজের সিদ্ধান্ত।
রমজানের শেষ দশ রাত যখন আসে, তখন প্রতিটি মুসলমানের উচিত দুনিয়ার ব্যস্ততা একপাশে রেখে জায়নামাজে বসা। কারণ যে রাতে একটি গোটা জীবনের সমান সওয়াব মেলে, সে রাতে জেগে থাকাটা শ্রম নয় — সেটা জীবনের সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে লাইলাতুল কদরের ফজিলত অর্জনের তওফিক দান করুন এবং এই রাতে আমাদের সকল গুনাহ মাফ করে দিন। আমিন।
সূত্র: সহিহ আল-বুখারি | সহিহ মুসলিম | সুনান আত-তিরমিযি | সুনান ইবনে মাজাহ | কুরআনুল কারিম | তাফসির ইবনে কাসির



