
প্রতি বছর আয়কর রিটার্নের সময় এলেই একটা প্রশ্ন সবার মাথায় ঘোরে — “আমার আয়কর আসলে কত হবে?” খাতা-কলমে হিসাব করতে গেলে করমুক্ত সীমা, স্ল্যাব, বিনিয়োগ রেয়াত, ন্যূনতম কর — এত কিছু মাথায় রাখতে হয় যে ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক।
ঠিক এই ঝামেলা কমাতেই আমাদের এই আয়কর ক্যালকুলেটর তৈরি করা হয়েছে। আপনার বেতন বা আয়ের তথ্য দিলেই এটি নিজে থেকে হিসাব করে বলে দেবে আপনাকে কত টাকা কর দিতে হবে — কোনো জটিল সূত্র মুখস্থ করার দরকার নেই।
আয়কর হিসাব করুন
২০২৬-২৭ অর্থবছরের হালনাগাদ হার অনুযায়ী
চলুন প্রথমে জেনে নেওয়া যাক, বাংলাদেশে আয়কর কীভাবে হিসাব হয় এবং কেন একটি ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা আপনার জন্য সহজ ও নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
কেন নিজে হিসাব না করে ক্যালকুলেটর ব্যবহার করবেন?
আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী প্রতিটি করদাতার আয়ের একটি অংশ করমুক্ত, তারপরের অংশ ধাপে ধাপে ভিন্ন ভিন্ন হারে করযোগ্য। এর মধ্যে আবার আছে বিনিয়োগ রেয়াত, স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন, এলাকাভিত্তিক ন্যূনতম কর — সব মিলিয়ে হাতে হিসাব করতে গেলে সাধারণত মানুষ হয় বেশি কর হিসাব করে ফেলেন, নয়তো কম করে ফেলেন যা পরে জরিমানার কারণ হতে পারে। একটি ভালো ক্যালকুলেটর এই সবকিছু একসাথে মাথায় রেখে নির্ভুল ফলাফল দেয়, আর আপনি সেই অনুযায়ী রিটার্ন জমা দেওয়ার আগেই নিজের করদায় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়ে যান।
২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষের করমুক্ত আয়সীমা
সাম্প্রতিক অর্থ আইনের মাধ্যমে সরকার আগামী কয়েক বছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা আগে থেকেই ঘোষণা করে দিয়েছে, যাতে করদাতারা পরিকল্পনা করার সুযোগ পান। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষের জন্য প্রযোজ্য সীমাগুলো হলো:
করদাতার শ্রেণিকরমুক্ত আয়সীমাসাধারণ করদাতা (পুরুষ)৳৩,৭৫,০০০নারী ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রবীণ করদাতা৳৪,২৫,০০০তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি৳৫,০০,০০০গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধা (২০২৪)৳৫,২৫,০০০
অর্থাৎ আপনার বার্ষিক আয় যদি আপনার শ্রেণির নির্ধারিত সীমার নিচে থাকে, তাহলে আপনাকে কোনো আয়কর দিতে হবে না। তবে মনে রাখবেন, একটি নির্দিষ্ট আয়সীমার ওপরে বা কিছু শর্তে পড়লে আয় করমুক্ত হলেও রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হতে পারে।
আয়কর স্ল্যাব বা করহার কীভাবে কাজ করে
করমুক্ত সীমা পার হওয়ার পর অবশিষ্ট আয়ের ওপর ধাপে ধাপে (progressive) হারে কর বসে — মানে পুরো আয়ের ওপর একই হারে কর কাটা হয় না, বরং প্রতিটি ধাপের নির্দিষ্ট অংশে আলাদা হার প্রযোজ্য হয়। সাধারণ করদাতাদের (পুরুষ, নারী, প্রবীণ ইত্যাদি সবার জন্য একই হার, শুধু করমুক্ত সীমা ভিন্ন) জন্য নতুন কাঠামোয় হার এরকম:
আয়ের ধাপকরহারকরমুক্ত সীমা পর্যন্ত০%পরবর্তী ৩,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত১০%পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত১৫%পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত২০%পরবর্তী ২০,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত২৫%অবশিষ্ট আয়ের ওপর৩০%
আগের কাঠামোয় থাকা সর্বনিম্ন ৫% স্ল্যাবটি এখন ১০%-এর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে করমুক্ত সীমা পার হওয়ার পরপরই তুলনামূলক বেশি হারে কর শুরু হয়। এটাই মূলত এমন একটি জায়গা, যেখানে অনেকে হাতে হিসাব করতে গিয়ে ধাপগুলো গুলিয়ে ফেলেন — একটি ক্যালকুলেটর এই ধাপগুলো নিজে থেকেই সঠিকভাবে প্রয়োগ করে দেয়।
একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক
ধরা যাক, একজন সাধারণ (পুরুষ) বেসরকারি চাকরিজীবীর বার্ষিক করযোগ্য আয় ৮,৬৪,০০০ টাকা। তাহলে হিসাবটা হবে এমন:
প্রথম ৩,৭৫,০০০ টাকা — করমুক্ত, কর ০ টাকা
পরের ৩,০০,০০০ টাকা — ১০% হারে কর = ৩০,০০০ টাকা
অবশিষ্ট ১,৮৯,০০০ টাকা (৬,৭৫,০০০ থেকে ৮,৬৪,০০০ পর্যন্ত) — ১৫% হারে কর = ২৮,৩৫০ টাকা
এভাবে ধাপে ধাপে যোগ করে মোট কর বের করতে হয়, তারপর সেখান থেকে বিনিয়োগ রেয়াত বাদ দিলে চূড়ান্ত প্রদেয় কর পাওয়া যায়। সংখ্যাগুলো একটু জটিল লাগছে? এখানেই ক্যালকুলেটরের কাজ — আপনি শুধু আয়ের অঙ্কটা বসিয়ে দিন, বাকি হিসাব ওটাই করে দেবে।
বিনিয়োগ রেয়াত: কর কমানোর বৈধ সুযোগ
সরকার-অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ করলে (যেমন সঞ্চয়পত্র, জীবন বীমার প্রিমিয়াম, ডিপিএস, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, প্রভিডেন্ট ফান্ডে জমা ইত্যাদি) মোট প্রদেয় করের ওপর নির্দিষ্ট হারে রেয়াত বা ছাড় পাওয়া যায়। এটি বৈধভাবে করের বোঝা কমানোর অন্যতম সহজ উপায়, তবে রেয়াতের সঠিক পরিমাণ নির্ভর করে আপনার মোট আয় ও বিনিয়োগের অঙ্কের ওপর। ক্যালকুলেটরে আপনার বিনিয়োগের তথ্য দিলে এই রেয়াতও হিসাবের মধ্যে যুক্ত হয়ে যায়।
চাকরিজীবীদের জন্য স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন
বেতনভোগী করদাতাদের ক্ষেত্রে মোট আয়ের এক-তৃতীয়াংশ অথবা একটি নির্দিষ্ট সর্বোচ্চ অঙ্ক, এই দুটোর মধ্যে যেটি কম, সেটি করযোগ্য আয় থেকে বাদ দেওয়া হয়। ফলে বেতনের পুরো অঙ্কের ওপর কর বসে না — এই বিষয়টাও অনেকে হিসাবে মিস করে ফেলেন।
ন্যূনতম কর: আয় কম হলেও কিছু ক্ষেত্রে কর দিতে হয়
করযোগ্য আয়ের হিসাবে কর শূন্য বা খুব কম এলেও, এলাকাভেদে একটি ন্যূনতম কর পরিশোধ করতে হতে পারে — সিটি কর্পোরেশন এলাকার করদাতাদের জন্য এই অঙ্ক তুলনামূলক বেশি, আর সিটি কর্পোরেশনের বাইরের করদাতাদের জন্য কম। যারা প্রথমবার রিটার্ন জমা দিচ্ছেন, তাদের জন্যও একটি বিশেষ ছাড়যুক্ত ন্যূনতম কর প্রযোজ্য হয়।
আরও দেখুনঃ Age Calculator – সেকেন্ডেই জেনে নিন আপনার সঠিক বয়স
২০২৬-২৭ করবর্ষে আরও যা যা পরিবর্তন এসেছে
উৎসে কর এখন চূড়ান্ত নয়, অগ্রিম কর: আগে অনেক ক্ষেত্রে উৎসে কর্তিত কর (WHT) চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে গণ্য হতো। এখন এটি অগ্রিম করের মতো — বছর শেষে প্রকৃত করদায় হিসাব করার পর বেশি কাটা থাকলে তা ফেরত (রিফান্ড) পাওয়া যাবে।
রিটার্ন জমার নমনীয়তা: বছরের যেকোনো সময় রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে, তবে জুলাই-সেপ্টেম্বরের মধ্যে আগেভাগে জমা দিলে প্রদেয় করের ওপর বিশেষ রেয়াত পাওয়ার সুযোগ থাকছে।
ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য সুখবর: নির্দিষ্ট শর্ত মেনে ও সঠিক ডকুমেন্টেশন রাখলে ফ্রিল্যান্সিং আয় করমুক্ত রাখার সুযোগ রয়েছে।
ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে যা যা জানতে পারবেন
উপরের এই স্তরগুলো — করমুক্ত সীমা, ধাপে ধাপে করহার, বিনিয়োগ রেয়াত, স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশন, ন্যূনতম কর — সব একসাথে মিলিয়ে হাতে হিসাব করা সময়সাপেক্ষ এবং ভুলের ঝুঁকিপূর্ণ। নিচের ক্যালকুলেটরে আপনার বার্ষিক আয়, করদাতার শ্রেণি এবং বিনিয়োগের তথ্য দিলেই সঙ্গে সঙ্গে আপনি পেয়ে যাবেন:
আপনার মোট করযোগ্য আয়
প্রযোজ্য স্ল্যাব অনুযায়ী ধাপে ধাপে করের হিসাব
বিনিয়োগ রেয়াত বাদ দেওয়ার পর চূড়ান্ত প্রদেয় কর
এলাকাভিত্তিক ন্যূনতম কর প্রযোজ্য হলে সেই তথ্য
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
করমুক্ত সীমার নিচে আয় থাকলেও কি রিটার্ন জমা দিতে হয়?
কিছু নির্দিষ্ট শর্তে (যেমন টিআইএন থাকলে, নির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা নিতে চাইলে) আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক হতে পারে।
একাধিক উৎস থেকে আয় থাকলে কীভাবে হিসাব হবে?
বেতন, ব্যবসা, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা বা অন্য যেকোনো উৎসের আয় একত্রে যোগ করে মোট আয়ের ভিত্তিতে করযোগ্য আয় নির্ধারণ করা হয়, তারপর সেই অনুযায়ী স্ল্যাব প্রয়োগ হয়।
ক্যালকুলেটরের ফলাফল কি আইনগতভাবে চূড়ান্ত?
ক্যালকুলেটর আপনাকে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য একটি ধারণা দেয়, তবে চূড়ান্ত রিটার্ন জমার আগে জটিল বা বড় অঙ্কের আয়ের ক্ষেত্রে একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া ভালো।
উপরের সব তথ্য সাম্প্রতিক অর্থ আইন ও এনবিআরের প্রকাশিত পরিপত্রের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। আইন যেকোনো সময় সংশোধিত হতে পারে, তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ এনবিআর প্রজ্ঞাপন যাচাই করে নেওয়া উত্তম।



