
তানিম তানভীর, ইবি প্রতিনিধিঃ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দুই শিক্ষার্থী গুমের ১৪ বছর পূর্ণ হলেও তাদের সন্ধান মেলেনি। এখনো তাদের খোঁজে প্রতীক্ষায় রয়েছে পরিবার।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে গুম হওয়া শিক্ষার্থী দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মো. ওয়ালিউল্লাহ ও আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের আল মুকাদ্দাসের সন্ধানের দাবিতে মানববন্ধন করেন অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী।
মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা ‘ওলি ভাই ফিরবে কবে, গুম কমিশন জবাব দে’, ‘মোকাদ্দাস ভাই ফিরবে কবে, ইন্টারিম জবাব চাই’, ‘আমার ভাই গুম কেন, জবাব চাই জবাব চাই’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।
আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের শিক্ষার্থী ও শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি রাশেদুল ইসলাম বলেন, ২০১২ সালে ঢাকা সাভার এলাকা থেকে ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাস ভাই গুম হয়েছিল। ৫ই আগস্টের পরে ভেবেছিলাম যে আমাদের ভাইরা হয়তো আমাদের কাছে ফিরে আসবে কিন্তু সেই অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়নি।
তিনি আরও বলেন, গত ১৭ বছরে আমাদের ওয়ালিউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাস ভাইসহ যতজন গুম হয়েছিল, সেগুলোর বিচার নিশ্চিত করুন। আর যদি সেই গুম-খুনগুলোর বিচার না হয়, তাহলে গুম-খুনের সংস্কৃতি বাংলাদেশে আবারও চালু হতে পারে। তাই গুম-খুনের এই সংস্কৃতি বন্ধ করার জন্য এর বিচার করতে হবে।
জানা যায়, ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে ঢাকা কল্যাণপুর থেকে হানিফ পরিবহনের এক বাসে উঠেন ওয়ালিউল্লাহ-মুকাদ্দাস। রাত সাড়ে ১১টায় বাসটি যাত্রা শুরু করে এবং রাত ১টায় সাভারের নবীনগর পৌঁছলে গাড়িটি হঠাৎ থেমে যায়।
সামনে থেকে র্যাব-৪ এর একটি কালো গাড়ি থেকে র্যাবের পোশাক পরিহিত ৮-১০ জন ও সাথে সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন গাড়িতে ওঠে। র্যাব ও ডিবি পরিচয়ে সিটে বসা যাত্রীদের মাঝ থেকে ওয়ালীউল্লাহ-মুকাদ্দাসকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তাদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি।
এ ঘটনার কয়েক দিন পর ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আশুলিয়া থানায় জিডি ও পরে হাইকোর্টে রিটও করে মুকাদ্দাসের পরিবার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুম হওয়া অনেককেই উদ্ধার করা হয়েছে গোপন বন্দিশালা থেকে। তবে তাদের খোঁজ আজও মেলেনি।
তাদের কোথায় রাখা হলো, বেঁচে আছেন নাকি মেরে ফেলা হয়েছে- এসব প্রশ্নের জবাব আজও রাষ্ট্রপক্ষ থেকে কেউ দিতে পারেনি। এ বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধানে পূর্বের গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি পুনর্গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে গঠিত কমিটিকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হলেও তার কোনো অগ্রগতি নেই বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুনঃ প্রার্থীর মৃত্যুতে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত
সন্তান ফেরার অপেক্ষায় ১৪ বছর ধরে দিন গুনছেন ওয়ালিউল্লাহর মা আসিফা রহমান ও বাবা মাওলানা ফজলুর রহমান। ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার পশ্চিম শৌলজালিয়া গ্রামের বাসিন্দা ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন সাত ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম। তিনি ইবিতে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত ছিলেন। পাশাপাশি শাখা ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
মুকাদ্দাস পিরোজপুর সদর উপজেলার খানাকুনিয়ারী গ্রামের মাওলানা আবদুল হালিম ও আয়শা সিদ্দিকা পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান। তিনি ইবির আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ও শাখা ছাত্রশিবিরের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। নিখোঁজ মুকাদ্দাসের সন্ধানে ঢাকায় একাধিকবার ‘মায়ের ডাক’ অনুষ্ঠানে যোগ দেন তার পরিবার। কিন্তু কোনো সুরাহা পাননি তারা।
মুকাদ্দাসের বাবা বলেন, গুম বা নিখোঁজ হওয়া সন্তানের সন্ধান দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। কী অপরাধ ছিল আমার ছেলের? সে আজও মৃত না জীবিত আমাদের জানার কী অধিকার নেই?



