
দেশে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, আমদানিনির্ভর জ্বালানির উচ্চ ব্যয় এবং ডিজেল ও এলএনজির চাহিদা বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার প্রেক্ষাপটে সরবরাহ পরিস্থিতিতে পুরোনো বিদ্যুৎ চুক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে বিগত বছরগুলোতে সম্পাদিত একাধিক চুক্তি এখন জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিযোগিতাহীন প্রক্রিয়ায় স্থাপিত কিছু বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তিতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদন না হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত হয়ে আসছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’-এর আওতায় গত এক দশকে ৯১টি বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়, যার মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। তবে এসব কেন্দ্রের অনেকগুলোর ক্ষেত্রে বাস্তব উৎপাদনের তুলনায় আর্থিক দায় বহুগুণ বেড়েছে বলে পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়নের জন্য সরকার ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। পরবর্তীতে কমিটি তাদের প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা, প্রয়োজনে পুনরায় আলোচনা বা বাতিলের সুপারিশ করে।
আরও পড়ুনঃ হরমুজে বাংলাদেশি ৬ জাহাজের অনুমতি, তবে ৫টিরই চালান বাতিল
পর্যালোচনায় অন্তর্ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গড্ডায় Adani Group-এর ১,৬০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেঘনাঘাট ও বাঁশখালীর একাধিক বড় প্রকল্প। বিশেষ করে আদানি বিদ্যুৎ চুক্তিকে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল ও প্রক্রিয়াগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে সরকারি পর্যালোচনা কমিটি।
সম্প্রতি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি খতিয়ে দেখা হবে। জাতীয় স্বার্থবিরোধী বা আর্থিকভাবে ক্ষতিকর কোনো চুক্তি থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন নয়, দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণও জরুরি। আমদানিনির্ভর কয়লা, তেল ও এলএনজির ওপর অতিনির্ভরতা দেশের বিদ্যুৎ খাতকে বৈশ্বিক বাজারের ধাক্কার মুখে ফেলছে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ এবং স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়ার ওপর গুরুত্ব বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।



