
সাকিবুল ইসলাম স্বাধীন, রাজশাহীঃ বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবারও আলোচনায় রাজশাহীর চন্দ্রিমা থানার সাবেক ওসি মাহবুব আলম। তবে এবার অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিয়ে, প্রতারণা ও একটি ফ্ল্যাটে বন্ধ দরজার রহস্য।
শুক্রবার ভোরে রাজশাহী নগরের নাদের হাজির মোড় এলাকায় একটি ফ্ল্যাটের সামনে এক নারীকে চিৎকার করতে ও বারবার দরজায় ধাক্কা দিতে দেখেন স্থানীয়রা। ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তিনি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ডাকাডাকি করলেও ফ্ল্যাটের দরজা খোলা হয়নি। পরে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। একপর্যায়ে কুঠার দিয়ে দরজা ভাঙা হলে ভেতর থেকে এক পুরুষ ও এক নারীকে বের করা হয়। ওই পুরুষ আর কেউ নন, চন্দ্রিমা থানার সাবেক ওসি মাহবুব আলম।
২০২৪ সালে চন্দ্রিমা থানার ওসি থাকাকালে মাহবুব আলমের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি খাম নিতে দেখা যায়। ওই ঘটনার পর তাকে চন্দ্রিমা থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
পরে তাকে নওগাঁয় বদলি করা হয়। সেখানে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। এরপর তাকে সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে সংযুক্ত করা হয়। কাগজে-কলমে তিনি এখনো ওই প্রশিক্ষণকেন্দ্রেই কর্মরত। তবে অভিযোগ রয়েছে, কোনো ছুটি বা অনুমতি না নিয়েই তিনি রাজশাহীতে চলে এসেছেন।
সিরাজগঞ্জ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের কমান্ড্যান্ট মোস্তাক আহমেদ বলেন, মাহবুব আলমের কোনো ছুটি নেই এবং তিনি কাউকে জানিয়েও রাজশিয়ায় আসেননি। অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করাও অপরাধ বলে জানান তিনি।
নাদের হাজির মোড়ের যে ফ্ল্যাটে মাহবুব আলমকে পাওয়া যায়, সেটি তার কথিত পালিত মেয়ের নামে ভাড়া নেওয়া বলে জানা গেছে। সাধারণত ওই ফ্ল্যাটে তার মেয়ে ও জামাই থাকেন। তবে বৃহস্পতিবার রাতে সেখানে মাহবুব আলমের সঙ্গে সানজিদা মৌ নামের এক নারী অবস্থান করছিলেন।
বিষয়টি জানতে পেরে নওগাঁর নারী উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতা আন্নি আক্তার রাজশাহীতে আসেন। তার দাবি, মাহবুব আলম তার স্বামী এবং চলতি বছরের শুরুতেই তাদের বিয়ে হয়েছে। তিনি নিজেকে মাহবুব আলমের ষষ্ঠ স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন।
আন্নির অভিযোগ, বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন, মাহবুব যে জেলায় পোস্টিং পান, সেখানেই নতুন করে বিয়ে করেন। এর আগে রাজশাহীর পদ্মা আবাসিক এলাকায় মাহবুবের নিজের ফ্ল্যাটেও তিনি সানজিদা মৌকে দেখেছেন বলে দাবি করেন। তখন বিষয়টি নিয়ে নীরব থাকলেও এবার আর চুপ থাকতে পারেননি বলে জানান আন্নি।
ফ্ল্যাটের দরজা ভাঙার পর বেরিয়ে মাহবুব আলম দাবি করেন, সানজিদা মৌ তার বিবাহিত স্ত্রী। তবে কাবিননামা দেখাতে বলা হলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। বরং মাহবুব দাবি করেন, আন্নিকে চার দিন আগেই তালাক দিয়েছেন এবং এ-সংক্রান্ত কাগজ পুলিশের কাছে দিয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ জবির ইকোনমিকস ক্যারিয়ার ক্লাবের নেতৃত্বে মাইশা-নাদিয়া
তবে মাহবুবের এই দাবি সরাসরি অস্বীকার করেন আন্নি আক্তার। তার ভাষ্য, তালাকের কোনো নোটিশ বা কাগজ তিনি পাননি। তার দাবি, শুধু মুখের কথায় তালাক কার্যকর হয় না।
এদিকে পুরো ঘটনার সময় সানজিদা মৌ নীরব ছিলেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে তিনি কোনো কথা বলেননি।
ঘটনার পর শুক্রবার দুপুরে চন্দ্রিমা থানায় লিখিত অভিযোগ দেন আন্নি আক্তার। মাহবুব আলম ও সানজিদা মৌকে থানায় আলাদা দুটি কক্ষে রাখা হয়। থানার ওসি ছুটিতে থাকায় তদন্ত পরিদর্শক মাহমুদ সিদ্দিকী জানান, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
একদিকে স্ত্রীর করা অভিযোগ, অন্যদিকে অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগের অভিযোগ—এর সঙ্গে রয়েছে আগের বিভাগীয় মামলাও। সব মিলিয়ে মাহবুব আলমকে ঘিরে নতুন করে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
যে চন্দ্রিমা থানায় একসময় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মাহবুব আলম, সেই থানাতেই এবার তাকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে অভিযোগের পরবর্তী সিদ্ধান্তের জন্য।
চন্দ্রিমা থানার সঙ্গে মাহবুব আলমের সম্পর্ক যেন এক অদ্ভুত বৃত্তে ঘুরছে—একবার ‘খাম কাণ্ডে’ থানা ছাড়তে হয়েছিল, আর এবার ‘ফ্ল্যাট কাণ্ডে’ সেই থানাতেই তাকে আটক করা হয়েছে।



