
পহেলা মে, আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস(মে দিবস) হিসেবে পরিচিত এই দিনটি শ্রমজীবী মানুষের আত্মত্যাগ, সংগ্রাম এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক। এই দিনের পেছনে রয়েছে এক বেদনাবিধুর ইতিহাস, যা মনে করিয়ে দেয়—অধিকার কখনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; তা সংগঠিত সংগ্রামের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
উনিশ শতকের শিল্পবিপ্লবের সময় ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় দ্রুত শিল্পায়নের ফলে শ্রমিক শ্রেণির সংখ্যা বাড়লেও তাদের জীবনমান ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখা যায়, অনেক কারখানায় শ্রমিকদের দৈনিক ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হতো, যেখানে সাপ্তাহিক ছুটি বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত ছিল। শিশু ও নারী শ্রমিকদেরও ব্যাপকভাবে কাজে নিয়োজিত করা হতো এবং তাদের মজুরি ছিল তুলনামূলকভাবে কম। এই অবস্থাকে অনেক গবেষক “wage slavery” বা মজুরিভিত্তিক দাসত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শ্রমিকরা ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে শুরু করে। তাদের প্রধান দাবি ছিল—“Eight hours for work, eight hours for rest, eight hours for what we will।” অর্থাৎ, আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা ব্যক্তিগত সময়। এই দাবির মধ্যেই মানবিক মর্যাদা ও জীবনের ভারসাম্যের প্রশ্নটি উঠে আসে।
১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় তিন লাখ শ্রমিক ধর্মঘটে অংশ নেয়, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল শিকাগো। ৪ মে শিকাগোর হে-মার্কেট স্কয়ারে একটি শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণের পর পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। পুলিশের গুলিতে শ্রমিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হতাহত হন। পরবর্তী বিচার প্রক্রিয়ায় প্রমাণের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও কয়েকজন শ্রমিক নেতাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং ১৮৮৭ সালে চারজনকে ফাঁসি দেওয়া হয়। পরে এই বিচারকে অন্যায্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পুনর্মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচিত।
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেসে ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৮৯০ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিবস পালিত হয়ে আসছে শ্রমিকদের অধিকার ও সংহতির প্রতীক হিসেবে।
বর্তমান বিশ্বে শ্রমিক অধিকার অনেকাংশে আইনি স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সংগঠনের স্বাধীনতা এবং সমষ্টিগত দরকষাকষির অধিকারসহ বিভিন্ন কনভেনশন শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
তবে বাস্তবতা এখনও জটিল। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শ্রমিকদের অবস্থা অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশ তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক কর্মরত থাকলেও তাদের জীবনযাত্রার মান সেই অবদানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ধস বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা হিসেবে স্বীকৃত, যেখানে সরকারি হিসাবে ১,১৩৪ জন শ্রমিক নিহত হন এবং কয়েক হাজার শ্রমিক আহত হন। এর আগে ২০১২ সালে আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ড-এও বহু শ্রমিক প্রাণ হারান। এসব ঘটনার পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কিছু উন্নতি এলেও চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি কাটেনি।
আরও পড়ুনঃ নির্বাচন যাতে পিছিয়ে না দেয় তাই জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছিঃ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বর্তমানে দেশে ন্যূনতম মজুরি কাঠামো থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অতিরিক্ত কাজের চাপ, বেতন বকেয়া, নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশ এবং ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে বাধা—এসব সমস্যা এখনও বিদ্যমান। শিশুশ্রমও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি, যদিও আইনগতভাবে তা নিষিদ্ধ।
এই প্রেক্ষাপটে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম শ্রমিক অধিকার বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ন্যায়ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বাণী—“শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করো”—ন্যায্য পারিশ্রমিক ও সময়মতো প্রদানের ওপর জোর দেয়।
শ্রমিকদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। তাদেরকে শুধু উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে নয়, বরং মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে দেখতে হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, মালিক ও সমাজ—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
মে দিবস কেবল অতীতের রক্তাক্ত ইতিহাস স্মরণ করায় না, বরং ভবিষ্যতের করণীয়ও সামনে তুলে ধরে। একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজ গড়তে শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। কারণ শ্রমিকের মর্যাদা রক্ষা মানেই মানবতার মর্যাদা রক্ষা।
লেখক ও কলামিস্ট: মোঃ রবিউস সানি জোহা
শিক্ষার্থী ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।



