
বুটেক্স প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রভাষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২১ মে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে দুইজন প্রভাষক নিয়োগের কথা উল্লেখ ছিল। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা সম্পন্ন হলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়নি।
নিয়োগকে ঘিরে আলোচনায় উঠে এসেছে দুই প্রার্থী—৪৪তম ব্যাচের মো. ইয়াসিন এবং ৪৬তম ব্যাচের নাফিস মাহমুদ অর্নব। সংশ্লিষ্টদের দাবি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং লিখিত পরীক্ষার ফলাফলে ইয়াসিন তুলনামূলকভাবে এগিয়ে ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, লিখিত পরীক্ষায় ইয়াসিন অর্নবের চেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছিলেন এবং মৌখিক পরীক্ষাতেও ভালো পারফরম্যান্স দেখান। তবে চূড়ান্ত ফলাফলে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
নিয়োগ বোর্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জুলহাস উদ্দিন, ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইমদাদ সরকার, অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. শিল্পী আক্তার, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আবু বকর সিদ্দিকী এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, ভাইভা বোর্ডে নম্বরায়ণের সময় ইয়াসিনের নম্বর কমিয়ে তাকে দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় অবস্থানে নামিয়ে আনা হয়। একই সঙ্গে বিভাগের দুই শিক্ষকের মতামতকেও প্রাধান্য দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় ভাইভা বোর্ডের ভেতরে মতবিরোধ ও বাকবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়েছিল বলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে। পরে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় উপস্থাপন করা হয় এবং সেখানে নাফিস মাহমুদ অর্নবকে চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেলেও এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
ভাইভা বোর্ডে উপস্থিত একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রভাবশালী মহলের সুপারিশের অভিযোগও উঠেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগী দাবি করা প্রার্থী মো. ইয়াসিন বলেন, লিখিত পরীক্ষা, ডেমোনস্ট্রেশন ও মৌখিক পরীক্ষা—প্রতিটি ধাপেই তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন। ভাইভা বোর্ডে প্রেজেন্টেশন শুরু করার পর উপাচার্য কক্ষ ত্যাগ করেন এবং পরে ফিরে আসেন। তিনি দাবি করেন, এক্সটার্নাল পরীক্ষকদের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দেওয়ার পরও বিভাগীয় প্রধান তাকে বোর্ডে গিয়ে একটি প্রশ্ন ব্যাখ্যা করতে বললেও উপাচার্য সময়ের অজুহাতে তা করতে দেননি। পরবর্তী ঘটনাগুলো বিবেচনায় পুরো বিষয়টি তার কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে।
আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে ইয়াসিন বলেন, পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি বলেন, শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য জীবনের সাতটি মূল্যবান বছর ব্যয় করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক দাবি করেন, ইয়াসিন লিখিত পরীক্ষায় ৫০ শতাংশের বেশি নম্বর এবং অর্নব ৪৪ শতাংশ নম্বর পেয়েছিলেন। ইয়াসিনের ভাইভাও অত্যন্ত ভালো হয়েছিল। কিন্তু পরে উপাচার্যের উদ্যোগে অর্নবকে বেশি নম্বর দেওয়া হয় এবং লিখিত পরীক্ষার নম্বরও পুনর্বিন্যাস করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, অধ্যাপক শিল্পী আক্তার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইয়াসিনকে সুপারিশ করলেও উপাচার্য তাতে সম্মত হননি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. শিল্পী আক্তার। তিনি বলেন, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সবাই মেধাবী ছিলেন। উপস্থাপনা, দক্ষতা ও সামগ্রিক যোগ্যতার ভিত্তিতেই প্রার্থীদের নির্বাচন করা হয়েছে। নিয়োগ বোর্ডের পাঁচ সদস্যের সর্বসম্মতিক্রমেই সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং সেখানে কেউ কোনো আপত্তি তোলেননি।
আরও পড়ুনঃ নৈতিকতা ও মূল্যবোধে ইবি শিক্ষার্থীরা অন্যদের চেয়ে এগিয়ে: উপাচার্য
নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তিনি অবগত নন। তার ভাষ্য, বোর্ডের সদস্যরা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের আওতায় উপাচার্যের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জুলহাস উদ্দিন বলেন, একজন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব অভিযোগ তুলেছেন। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া প্রার্থীরাই নির্বাচিত হয়েছেন। পাঁচ সদস্যের বোর্ডের সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং সেখানে দুর্নীতির কোনো সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, যাকে ভুক্তভোগী বলা হচ্ছে, তার চেয়েও লিখিত পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া একজন প্রার্থীও নির্বাচিত হননি। নির্বাচিত দ্বিতীয় প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষার নম্বর কিছুটা কম থাকলেও ডেমোনস্ট্রেশন ও ভাইভায় তার পারফরম্যান্স ভালো হওয়ায় তিনি নির্বাচিত হয়েছেন।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, নির্বাচিত প্রার্থীদের তিনি ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না। নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক সুপারিশ আসেনি এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, মো. ইয়াসিন ২০২৩ সালে ৩.৯৬ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন এবং বর্তমানে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত। তিনি নিটারে প্রভাষক, বুটেক্সে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পার্ট-টাইম প্রভাষক এবং প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি শিল্পখাতে প্রায় এক বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
অন্যদিকে নাফিস মাহমুদ অর্নব ২০২৫ সালে ৩.৮১ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তার অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাত মাস ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।



