
সামরিক জগতে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে—‘কঠিন প্রশিক্ষণ, সহজ যুদ্ধ’। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ যত কঠোর ও বাস্তবসম্মত হবে, যুদ্ধক্ষেত্রে সাফল্যের সম্ভাবনা তত বাড়বে। একজন সৈনিকের কার্যকারিতা যেমন নির্ভর করে তার প্রশিক্ষণের ওপর, ঠিক তেমনি একজন গ্র্যাজুয়েটের কর্মজীবনের সফলতাও নির্ভর করে ছাত্রজীবনে অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রস্তুতির ওপর। কিন্তু বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না। ফলে অনেক গ্র্যাজুয়েট কর্মক্ষেত্রের বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুত করতে পারছেন না।
শুধু বাংলাদেশ নয়, বর্তমান বিশ্বেই উচ্চশিক্ষা একটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, অর্থনৈতিক পরিবর্তন, কর্মক্ষেত্রের নতুন চাহিদা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংকট আরও জটিল হয়ে উঠেছে, কারণ অনেক সময় সমস্যার মূল জায়গাগুলো নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা বা সংস্কারের উদ্যোগ দেখা যায় না।
বিশ্বব্যাপী উচ্চশিক্ষার সংকটকে সাধারণত অর্থনৈতিক, সামাজিক, শিক্ষণ পদ্ধতিগত, নৈতিক এবং প্রযুক্তিগত—এই পাঁচটি বড় মাত্রায় দেখা হয়।
উচ্চশিক্ষার অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম দিক হলো শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষা জ্ঞানচর্চার মাধ্যম থেকে ধীরে ধীরে বাজারমুখী সেবায় পরিণত হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা উচ্চশিক্ষার পেছনে বড় বিনিয়োগ করলেও অনেক সময় ডিগ্রির মূল্যায়ন হচ্ছে চাকরির বাজারে তার ব্যবহারিক সুবিধার ভিত্তিতে। ফলে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে সার্টিফিকেট অর্জনের প্রবণতা বাড়ছে।
অন্যদিকে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রেও সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনের পরও যদি একজন শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারেন, তাহলে উচ্চশিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।
সবচেয়ে বড় সংকট দেখা যাচ্ছে শিক্ষণ পদ্ধতিতে। এখনও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাব্যবস্থা মুখস্থনির্ভর, পরীক্ষাকেন্দ্রিক এবং তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। শিক্ষার্থীরা তথ্য গ্রহণ করছে, কিন্তু বিশ্লেষণ করার দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না। তারা উত্তর লিখতে শিখছে, কিন্তু বাস্তব সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা অর্জন করতে পারছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নৈতিক সংকটও। প্রযুক্তি ও প্রতিযোগিতার যুগে দক্ষ পেশাজীবী তৈরির পাশাপাশি দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করাও জরুরি। কিন্তু বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নেতৃত্বের গুণাবলীর চর্চা অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাচ্ছে।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনও উচ্চশিক্ষার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তি কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলে দিচ্ছে। কিন্তু অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো সেই পরিবর্তনের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং তারা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই সংকট মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার মূল দায়িত্ব শিক্ষকদের ওপর। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেবেন, তারা নিজেরা কতটা প্রস্তুত?
বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মূলত একাডেমিক ফলাফল, উচ্চতর ডিগ্রি এবং গবেষণাপত্রের সংখ্যাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু একজন শিক্ষক কতটা কার্যকরভাবে পাঠদান করতে পারেন, তার যোগাযোগ দক্ষতা কেমন, তিনি শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে পারেন কি না, বাস্তব কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে তার ধারণা কতটুকু—এসব বিষয় অনেক সময় যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না।
ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে যেখানে অনেক শিক্ষক সারাজীবন একাডেমিক পরিবেশের মধ্যেই থাকছেন, কিন্তু যেসব শিল্পখাত বা পেশার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করছেন, সেই খাতের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের সীমিত।
একজন ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষক যদি কখনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় কাজ না করেন, একজন প্রযুক্তি শিক্ষকের যদি বাস্তব সফটওয়্যার প্রকল্পে অভিজ্ঞতা না থাকে কিংবা একজন প্রকৌশল শিক্ষকের যদি আধুনিক শিল্পকারখানার প্রযুক্তিগত পরিবেশ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা না থাকে—তাহলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব কর্মক্ষেত্রের জন্য কতটা প্রস্তুত হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
একাডেমিক জ্ঞান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব দক্ষতার সংযোগ তৈরি না হলে উচ্চশিক্ষা তার পূর্ণ উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে না।
আরও পড়ুনঃ বিশ্ববিদ্যালয়কে পাল্টে দেওয়ার সময় এসেছে: বোতল ফিডিং আর কত দিন?
বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু যারা শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তাদের দক্ষতা ও প্রস্তুতি নিয়েও সমান গুরুত্বে ভাবা প্রয়োজন। একজন শিক্ষককে শুধু বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানসম্পন্ন হলেই হবে না; তাকে হতে হবে দক্ষ প্রশিক্ষক, ভালো যোগাযোগকারী, প্রযুক্তি সচেতন এবং বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত একজন শিক্ষাবিদ।
উচ্চশিক্ষার সংস্কার মানে শুধু নতুন ভবন নির্মাণ বা নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রয়োজন শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থায়।
কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারিত হয় শুধু অবকাঠামো দিয়ে নয়; নির্ধারিত হয় শিক্ষক, শিক্ষার্থীর দক্ষতা এবং গ্র্যাজুয়েটদের সফলতার মাধ্যমে। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার শিক্ষাব্যবস্থার ওপর।
তাই উচ্চশিক্ষার সংকট কাটাতে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কেমন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে চাই? আর তার আগে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আমরা কেমন শিক্ষক তৈরি ও নিয়োগ দিচ্ছি?
লেখকঃ সহযোগী অধ্যাপক ড. ফুয়াদ হোসেন
ডীন, স্বাস্থ্য বিজ্ঞান অনুষদ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।



