
স্মার্টফোনের একটি স্পর্শ, দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ আর ডিজিটাল ওয়ালেটের সহজলভ্যতা—এই তিনের সমন্বয়ে বর্তমান সময়ে তরুণদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে এক নতুন ও ভয়ংকর আসক্তি, যার নাম অনলাইন জুয়া। একসময় জুয়া বা ক্যাসিনোর আসর নির্দিষ্ট কিছু অন্ধকার গলি কিংবা গোপন আস্তানায় সীমাবদ্ধ থাকলেও প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এখন তা পৌঁছে গেছে মানুষের পকেটে, ঘরের ড্রয়িংরুমে কিংবা পড়ার টেবিলে। ফলে দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ খুব সহজেই জড়িয়ে পড়ছে এই ঝুঁকিপূর্ণ আসক্তির জালে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, অনলাইন জুয়া শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়; এটি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি এর অপব্যবহার নতুন ধরনের সংকটও তৈরি করছে।
বিশ্বজুড়ে অনলাইন জুয়ার বিস্তার বর্তমানে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কিশোর-তরুণ কোনো না কোনোভাবে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন দেশের জরিপে দেখা গেছে, উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও অনলাইন বেটিংয়ের প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষ করে খেলাধুলাভিত্তিক বাজি বা স্পোর্টস বেটিং তরুণদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফুটবল, ক্রিকেটসহ জনপ্রিয় খেলাগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে বড় একটি অনলাইন জুয়ার বাজার।
অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। শুরুতে ছোটখাটো জয় একজন ব্যবহারকারীর মধ্যে উত্তেজনা ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। সে মনে করতে শুরু করে, সহজেই অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। কিন্তু পরবর্তীতে যখন ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে থাকে, তখন সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে থাকে। এভাবেই একজন সাধারণ ব্যবহারকারী ধীরে ধীরে ভয়ংকর আসক্তির দিকে চলে যায়।
এই আসক্তির প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘমেয়াদে এর কারণে তরুণদের মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ, অনিদ্রা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ঋণের চাপ বা আর্থিক সংকট থেকে কেউ কেউ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো ভয়াবহ পথেও চলে যায়।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা অনলাইন জুয়ার বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করছে। বিভিন্ন কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সারের মাধ্যমে জুয়াকে অনেক সময় সাধারণ বিনোদন বা সহজ আয়ের মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। এতে তরুণরা বিভ্রান্ত হয়ে আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। দেশের বড় একটি অংশ তরুণ জনগোষ্ঠী, যাদের শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত হওয়ার কথা। কিন্তু সেই সম্ভাবনাময় তরুণদের একটি অংশ দ্রুত ধনী হওয়ার ভুল ধারণায় অনলাইন জুয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
মোবাইল ব্যাংকিং সেবার সহজলভ্যতা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তারের কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণরাও এখন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জুয়ার প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছে। যে বয়সে একজন তরুণ নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করার কথা, সে বয়সেই অনেকে অল্প সময়ে ভাগ্য বদলের আশায় জড়িয়ে পড়ছে অনিশ্চিত এক পথে।
ফ্রি ফায়ার বা পাবজির মতো অনলাইন গেমের বিভিন্ন ইন-অ্যাপ পারচেজ থেকে শুরু করে আইপিএল, বিপিএল কিংবা বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় স্পোর্টস বেটিংয়ের প্রবণতা বেড়ে যায়। বাস্তবতা হলো, এসব জুয়ার প্ল্যাটফর্ম এমনভাবে পরিচালিত হয় যেখানে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয় মূলত পরিচালনাকারীরাই। আর ক্ষতির মুখে পড়ে সাধারণ ব্যবহারকারীরা।
এর ফলে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশি প্ল্যাটফর্মে চলে যাচ্ছে। পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির কারণে অনেক তরুণ পরিবারে অশান্তি, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
এই সংকট মোকাবিলায় পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অভিভাবকদের সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম, ডিজিটাল লেনদেন এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। একই সঙ্গে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে অনলাইন ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুনঃ বিশ্বকাপে ব্রাজিল-হাইতি: চ্যাম্পিয়নদের পুনরুত্থান বনাম ইতিহাস রচনার স্বপ্ন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও সাইবার সচেতনতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করার উদ্যোগ বাড়াতে হবে। তরুণদের সামনে বিকল্প ইতিবাচক বিনোদন, দক্ষতা উন্নয়ন ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অবৈধ জুয়ার ওয়েবসাইট ও অ্যাপ বন্ধে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, জুয়ার প্রচারণাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
তরুণরাই একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের মেধা, সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতার ওপর নির্ভর করে একটি জাতির ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই সম্ভাবনা যদি অনলাইন জুয়ার অন্ধকার জগতে হারিয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজ ও রাষ্ট্র।
অনলাইন জুয়া হয়তো কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনা বা রোমাঞ্চ তৈরি করতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই একটি সুন্দর ভবিষ্যতের বিকল্প হতে পারে না। তাই তরুণ প্রজন্মকে রক্ষায় এখনই প্রয়োজন সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা এবং কার্যকর পদক্ষেপ।
লেখক – মোঃ রবিউস সানি জোহা
শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড জিওগ্রাফী বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।



