
বহুল প্রতীক্ষিত মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় দেশে সংশ্লিষ্ট মহল, ভুক্তভোগী পরিবার ও বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো না রাখার বিষয়ে সরকারি দলের সিদ্ধান্তে কমিশন তার কার্যকারিতা হারাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে গুম ও ক্রসফায়ারের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে কমিশনকে ঘিরে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা ভেঙে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ একাধিক সংস্থার চেয়ারম্যান ও সদস্যরা পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে অন্যান্য কমিশন পুনর্গঠন করা হলেও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন করে ২০২৫ সালের নভেম্বরে একটি নতুন অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এতে গুম তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল হোসেনসহ কয়েকজন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে তারা কার্যক্রম শুরু করার আগেই অধ্যাদেশটি কার্যত বাতিলের মুখে পড়ে।
সংবিধান অনুযায়ী, কোনো অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পেলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে অধ্যাদেশটি বিল আকারে সংসদে উত্থাপন না করায় এটি অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে বলেন, গুমসংক্রান্ত আইনের প্রস্তাবিত বিধান ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংজ্ঞার মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। এ কারণে আইনগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই প্রয়োজন। তিনি আশ্বস্ত করেন, গুমের সঙ্গে জড়িতরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে না।
অন্যদিকে গুমের শিকার জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর ছেলে সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমান সরকারের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, অধ্যাদেশটি বাতিল না করে আগে আইন হিসেবে পাস করে পরে সংশোধন আনা হলে সরকারের সদিচ্ছা স্পষ্ট হতো। তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের পর আইনটি বাতিল হয়ে গেলে গুমের কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞাই থাকবে না।
মানবাধিকার কমিশনের সদস্য মো. নূর খান বলেন, নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশন নিজ উদ্যোগে তদন্ত শুরু ও প্রয়োজনীয় নথি তলব করতে পারত, যা এখন আর সম্ভব হবে না।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যেও হতাশা স্পষ্ট। খুলনার মোস্তাফিজুর রহমান সিফাতের ভাই মাহফুজ শাকিল অভিযোগ করেন, কোনো অভিযোগ ছাড়াই তার ভাইকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত।
আরও পড়ুনঃ চুক্তিতে না এলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র: পেন্টাগনে হুঁশিয়ারি
কমিশনের চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও নজিরবিহীন। তিনি জানান, কমিশনকে আন্তর্জাতিক মানের ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল, যা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সহায়ক হতো।
অধ্যাদেশ বাতিলের উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা রাইট টু ফ্রিডম, টিআইপি এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থা এ বিষয়ে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সামগ্রিকভাবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সমন্বিত ও কার্যকর আইনি কাঠামো ছাড়া মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে এবং গুম-ক্রসফায়ারের মতো গুরুতর অভিযোগের বিচার প্রক্রিয়া আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।



