
ফুটবল বিশ্বকাপ—যাকে বলা হয় ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। এই আসর শুরু হলেই বাংলাদেশ যেন নতুন এক রূপ নেয়। চারদিকে তৈরি হয় উৎসবের আবহ, রাস্তাঘাট, বাড়ির ছাদ, দোকানপাট থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বকাপের উন্মাদনা।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শুরু হয়েছে ১১ জুন মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দল এখনো বিশ্বকাপের মঞ্চে জায়গা করে নিতে পারেনি, তবে ফুটবলের প্রতি এ দেশের মানুষের আবেগ কোনো অংশেই কম নয়। বরং অনেক সময় দেখা যায়, প্রিয় বিদেশি দলের প্রতি বাংলাদেশিদের ভালোবাসা ও সমর্থন সেই দেশের নাগরিকদের আবেগকেও ছাড়িয়ে যায়।
বিশ্বকাপ এলেই কোথাও ব্রাজিলের সবুজ-হলুদ পতাকা, কোথাও আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা রং, আবার কোথাও ফ্রান্স, জার্মানি কিংবা পর্তুগালের পতাকা শোভা পায়। তরুণরা প্রিয় দলের জার্সি পরে ঘুরে বেড়ায়, চায়ের দোকানগুলো পরিণত হয় ছোটখাটো স্টেডিয়ামে। রাত জেগে খেলা দেখা, বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা, ম্যাচ বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য পরিবেশ।
এই আনন্দের মাঝেও রয়েছে একটি উদ্বেগজনক দিক। অনেক সময় ফুটবল সমর্থন স্বাস্থ্যকর বিনোদনের সীমা অতিক্রম করে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়। কে বড় পতাকা টানাবে, কার দল বেশি শক্তিশালী, কে বেশি উল্লাস করবে—এসব নিয়ে শুরু হয় অদৃশ্য প্রতিযোগিতা। আর সেখান থেকেই তৈরি হয় বিভেদ।
খেলা নিয়ে আলোচনা, তর্ক কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন তা ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি বা অপমানের পর্যায়ে চলে যায়, তখন এর সৌন্দর্য নষ্ট হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালিগালাজ, ট্রল এবং বিদ্বেষমূলক মন্তব্য অনেক সময় স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কখনো কখনো এই তর্ক বাস্তব জীবনে সহিংসতায় রূপ নেয়। খেলা নিয়ে মারামারি, সম্পর্ক নষ্ট হওয়া কিংবা সামাজিক অস্থিরতার ঘটনাও দেখা যায়। অথচ আমরা ভুলে যাই—আমরা যেসব দলকে সমর্থন করি, তারা আমাদের দেশের দল নয়; আমরা কেবল তাদের খেলার সৌন্দর্যের ভক্ত।
বিশ্বকাপের সময় শব্দদূষণও একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। গভীর রাতে খেলা শেষে চিৎকার, আতশবাজি, মোটরসাইকেল নিয়ে শোডাউন কিংবা অতিরিক্ত হর্ন—এসব অন্যদের জন্য ভোগান্তির কারণ হতে পারে। একজন অসুস্থ মানুষ, বৃদ্ধ কিংবা শিশুর জন্য এই অতিরিক্ত শব্দ কতটা কষ্টদায়ক হতে পারে, সেটিও আমাদের বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
আরও পড়ুনঃ আবাসিকতার বিজ্ঞপ্তি না দেওয়ায় ইবির আজিজ হলে শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি
এ ছাড়া বড় পতাকা বা ব্যানার টানানোর ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া জরুরি। বিদ্যুতের লাইনের ওপর পতাকা টানানো কিংবা রাস্তার চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
বিশ্বকাপের সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ে—ছোট ব্যবসায়ীরা লাভবান হন, এটি ইতিবাচক দিক। তবে শুধুমাত্র সামাজিক প্রদর্শনের জন্য অপ্রয়োজনীয় খরচ করাও এক ধরনের অপচয়। বড় পতাকা, দামি জার্সি কিংবা আয়োজনের চেয়ে খেলার সৌন্দর্য উপভোগ করাই হওয়া উচিত মূল উদ্দেশ্য।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ফুটবল মানুষকে একত্র করার মাধ্যম। এটি বিভাজনের কারণ হওয়া উচিত নয়। তাই খেলাকে খেলাধুলার জায়গায় রেখে প্রতিপক্ষের সমর্থকদের সম্মান করা, উল্লাসে সংযম রাখা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ করা জরুরি।
বিশ্বকাপ আমাদের আনন্দ দেয়, নতুন স্মৃতি তৈরি করে। কিন্তু একটি ম্যাচের ফলাফল কয়েক মিনিটে বদলে যেতে পারে, অথচ একটি সম্পর্ক নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাই আসুন, বিভেদ নয়—ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও বন্ধুত্বের মাধ্যমে বিশ্বকাপ উপভোগ করি।
লেখক: আব্দুর রাব্বি হাসান ওয়ালিদ
শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া



